দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র চট্টগ্রামে গত দুই বছরে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে প্রায় ১৯০টি শিল্পকারখানা। এসব কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়েছেন প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক ও কর্মচারী। শিল্পকারখানা বন্ধের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, ঋণ ও এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা, বিদ্যুৎ সংকটসহ আটটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শিল্প পুলিশ-৩-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে শিল্পাঞ্চলটিতে প্রায় ১৯০টি কারখানা স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৮টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। বাকিগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ হওয়া কারখানার মধ্যে ৬৮টি তৈরি পোশাক (আরএমজি) কারখানা। অন্যগুলো নন-আরএমজি, সাধারণ ও রপ্তানিমুখী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাটকল, ওষুধ কারখানা, ভোজ্যতেল ও বনস্পতি তেল কারখানা, সিমেন্ট ও ইস্পাত কারখানা, চিনিকল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জাহাজ ভাঙা শিল্পের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। শিল্প পুলিশ বলছে, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার শ্রমিকদের একটি অংশ পেশা পরিবর্তন করেছেন। কেউ কেউ অন্য কারখানায় একই ধরনের কাজও খুঁজে নিয়েছেন। তবে কারখানা বন্ধের কারণে মোট কত শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছেন, তার নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান শিল্প পুলিশের কাছে নেই। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো পুনরায় চালুর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদেরই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। উদ্যোক্তারা উদ্যোগী না হলে সরকার যত অর্থই ব্যয় করুক, শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগ কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। আট কারণে চাপ। সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চট্টগ্রামে শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যর্থতা, মালিকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছু মালিকের দেশত্যাগ ও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা, বিদ্যুৎ সংকট, ঋণ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে সমস্যা। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতে বিদেশি ক্রেতাদের ক্রয়াদেশ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ, কাঁচামাল আমদানি এবং শ্রমিকদের মজুরি দেওয়ার চাপ বেড়েছে। ফলে আর্থিক সংকটে থাকা অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারেনি। তৈরি পোশাক খাতেও একই ধরনের চাপের কথা জানিয়েছেন খাত-সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক এবং এশিয়ান গ্রুপের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাকিফ আহমেদ সালাম বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর থেকেই পোশাক খাতকে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, এলসি-সংক্রান্ত জটিলতা, ঋণের চাপ এবং ক্রয়াদেশ বাতিলের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়েছে। লোকসানের চাপ সামলাতে না পেরে অনেক প্রতিষ্ঠান শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা বন্ধের প্রভাব শুধু শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন কমে গেলে সরবরাহকারী, পরিবহন, কাঁচামাল ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট পুরো শিল্পশৃঙ্খলে এর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও সরকারের রাজস্বেও নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হয়। শিল্প পুলিশ-৩, চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম বলেন, গত কয়েক বছরে বিভিন্ন কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বেশ কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে কিছু স্থায়ী এবং কিছু অস্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। চাকরি হারানো অনেক শ্রমিক পেশা পরিবর্তন করেছেন, আবার অনেকে অন্য কারখানায় একই ধরনের কাজ পেয়েছেন। তিনি বলেন, কত শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান শিল্প পুলিশের কাছে নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে হলে শুধু অর্থায়ন নয়, উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা, ব্যাংকঋণ পুনর্গঠন, আমদানি-রপ্তানিতে এলসি সুবিধা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত উৎপাদনে ফেরাতে কার্যকর নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন।