দীর্ঘদিনের ভোগান্তি ও অনিশ্চয়তার পর গ্রাহকদের আস্থা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগোচ্ছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। ব্যক্তি পর্যায়ের গ্রাহকদের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবে স্বাভাবিক লেনদেন, মাসিক মুনাফা নিয়মিত পরিশোধ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আমানতের অর্থ পাওয়ার সুযোগ চালুর মধ্য দিয়ে ব্যাংকটি স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. আবেদুর রহমান সিকদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিন চাহিদা অনুযায়ী সেবা দিতে না পারার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন গ্রাহক তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ প্রয়োজনের সময় ব্যবহারের জন্য ব্যাংকে রাখেন। সেই অর্থ সময়মতো দিতে না পারা একজন ব্যাংকারের জন্যও কষ্টের। তিনি বলেন, ব্যক্তিপর্যায়ের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের গ্রাহকরা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে পারছেন। চাইলে হিসাবের পুরো স্থিতিও তুলে নিতে পারবেন। একই সঙ্গে মাসিক মুনাফাভিত্তিক হিসাবের গ্রাহকদের নিয়মিত মুনাফা দেওয়া হচ্ছে। মেয়াদি আমানত, ডিপিএস বা মাসিক স্কিমের কোনো গ্রাহক ব্যাংকের সঙ্গে আর লেনদেন চালিয়ে যেতে না চাইলে মূল আমানতের অর্থ ফেরত নেওয়ার সুযোগও রাখা হয়েছে। আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ধারণা করেছিল, স্বাভাবিক লেনদেনের সুযোগ পাওয়ার পর অনেক গ্রাহক হয়তো পুরো অর্থ তুলে নেবেন। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ গ্রাহকই টাকা ব্যাংকে রেখে লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। নিয়মিত মুনাফা পেলে তারা ব্যাংকের সঙ্গেই থাকতে চান বলে জানিয়েছেন। এটিকে ব্যাংকের জন্য বড় ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখছেন তিনি। দীর্ঘদিনের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গ্রাহকদের একটি বড় অংশ ব্যাংকের ওপর আস্থা রেখেছেন, যা ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন এমডি।
তিনি বলেন, আগে কোনো গ্রাহক শাখায় এলে তাকে কীভাবে সেবা দেওয়া হবে, তা নিয়ে কর্মীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা ছিল। এখন সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় কর্মীদের মধ্যেও নতুন উদ্দীপনা এসেছে।
প্রবাসীদের উৎকণ্ঠাও কমেছে : প্রবাসী গ্রাহকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার কথা জানিয়েছেন আবেদুর রহমান সিকদার। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অনেক প্রবাসী ফোন ও বার্তার মাধ্যমে তাদের সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই বলেছেন, তারা টাকা তুলে নিতে চান না; বরং সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন চালিয়ে যেতে চান। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কাটতে শুরু করায় তারা স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। ব্যাংকের এমডি বলেন, দেশ ও বিদেশে থাকা গ্রাহকদের এই সাড়া ব্যাংকটির সামনে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ পাওয়ার সুযোগ : ব্যাংকে অর্থ রাখার উদ্দেশ্যই হলো প্রয়োজনের সময় তা ব্যবহার করা-এ কথা উল্লেখ করে আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, জরুরি প্রয়োজনের ক্ষেত্রে যথাযথ বিবেচনায় গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় অর্থ দেওয়া হচ্ছে। ব্যক্তিপর্যায়ের সঞ্চয়ী ও চলতি হিসাবের লেনদেনে এখন কোনো সীমা বা বাধা নেই। গ্রাহকরা টাকা জমা ও উত্তোলনের পাশাপাশি নতুন হিসাবও খুলতে পারছেন। পাশাপাশি কেউ ব্যাংক ছাড়তে চাইলে তার মূল আমানত ফেরত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এমডির আশা, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে চলতে থাকলে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাংক পুরোপুরি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরবে এবং গ্রাহকদের আস্থা আরও দৃঢ় হবে।
পুরোনো গ্রাহকদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ : ব্যক্তিপর্যায়ের লেনদেন স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ধাপে ধাপে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ব্যবসা মূলত রিটেইল, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এবং করপোরেট খাতকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছু ব্যবসায়িক গ্রাহক অন্য ব্যাংকে লেনদেন বাড়িয়েছেন। এখন তাদের আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, প্রথমে পুরোনো ও বিশ্বস্ত গ্রাহকদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক জোরদার করা হবে। যারা আগে ব্যাংকটির সঙ্গে বড় পরিসরে ব্যবসা করতেন, তাদের ফিরিয়ে আনার পর পর্যায়ক্রমে নতুন গ্রাহকের দিকে নজর দেওয়া হবে। ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুরোপুরি ফিরে এলে বড় মূলধনভিত্তি কাজে লাগিয়ে ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি আশা করেন।
সেপ্টেম্বরেই গুলশানে মডেল শাখা : গ্রাহকদের সমন্বিত সেবা দিতে চলতি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই রাজধানীর গুলশানে একটি মডেল শাখা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের। আবেদুর রহমান সিকদার জানান, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শাখাটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এটি সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের নিজস্ব পরিচয়ে পরিচালিত হবে এবং আগের পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকরা সেখানে সেবা নিতে পারবেন।
তিনি বলেন, একটি শাখায় আগের পাঁচ ব্যাংকের গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার ধারণা থেকেই এই মডেল শাখা করা হচ্ছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় কাছাকাছি স্থানে আগের ব্যাংকগুলোর একাধিক শাখা রয়েছে। ভবিষ্যতে সেগুলোকে প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। গুলশানের শাখাটি হবে এ উদ্যোগের প্রথম ধাপ। প্রথমে একটি দিয়ে শুরু করে পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে মডেল শাখার সংখ্যা বাড়ানো হবে।
আধুনিক ও মানসম্মত ব্যাংক গড়ার লক্ষ্য : ব্যাংকের বড় শাখা-উপশাখা, এটিএম নেটওয়ার্ক ও কর্মিবাহিনীকে কাজে লাগিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন আবেদুর রহমান সিকদার। তিনি বলেন, ব্যাংকের কর্মীরা আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন। গ্রাহকদের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি সুশৃঙ্খল ব্যাংকিং পরিবেশ গড়ে তোলাই তাদের লক্ষ্য।
তাঁর মতে, আর্থিক খাতে আস্থা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হলে এর ইতিবাচক প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ে। ব্যাংকের শাখা থাকা এলাকায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে এবং ব্যাংকিংয়ের বাইরে থাকা মানুষকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় আনার সুযোগ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চান জানিয়ে তিনি বলেন, এমন একটি ব্যাংক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে, যার সঙ্গে ব্যাংকিং করে গ্রাহক এবং সেখানে কাজ করে কর্মীরা গর্ববোধ করবেন। দীর্ঘদিনের প্রতিকূলতার মধ্যেও ব্যাংকের সঙ্গে থাকা গ্রাহকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবেদুর রহমান সিকদার বলেন, তাঁদের আস্থাকে ভিত্তি করেই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে একটি শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য ব্যাংক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাঁরা।