খুলনার গোয়ালখালী মোড়সংলগ্ন রেললাইনের গাঁ ঘেষে গড়ে উঠেছে সারিবদ্ধ ঘুপচি। সেখানে হাজারো মানুষের বাস। সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে এ বস্তি। এ বস্তি এখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। সামাজিক অবক্ষয়ের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে হাতের নাগালে পাওয়া যায় ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদক। সঙ্গে রয়েছে অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি। শুধু এ বস্তিই নয়, খুলনা মহানগরীতে ছোটবড় মিলিয়ে ৫ শতাধিক বস্তি আছে। সব বস্তির অবস্থা প্রায় এক। এ বস্তিগুলোর অনেক মানুষই এখন বস্তি ছেড়ে আধুনিক এলাকা খ্যাত পুরাতন শেখপাড়া, কেডিএ অ্যাভিনিউ, নজরুলনগর স্কুল মোড়, শেখপাড়া হাজী ইসমাইল রোডে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি করছে। এদের আশ্রয় দিচ্ছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা। বস্তি এলাকার ছিন্নমূল শিশু-কিশোর, যুবক ও নিম্ন আয়ের মানুষকে দ্রুত আয়ের লোভ দেখিয়ে মাদক বিক্রিতে যুক্ত করে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো। গ্রেপ্তার হলেও জামিনেরও ব্যবস্থা করে এ সিন্ডিকেট। ফলে তারা জামিন পেয়ে আবারও মাদক বিক্রিতে জড়িয়ে পড়ে।
পুুলিশের তথ্যানুযায়ী, নগরীর ঘাট এলাকা, লবণচরা, টুটপাড়া, বানিয়াখামার, সোনাডাঙ্গা, শেখপাড়া, খালিশপুর, দৌলতপুরে শতাধিক বস্তি ঘিরে মাদকের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। আর সেখানে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে গ্যাং কালচারের উত্থান ঘটেছে। ছোট দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের অধীনে মাদক বিক্রি হচ্ছে। মাদক বেচাকেনা পালাক্রমে ডিউটি করে বিক্রেতারা। মাদক পৌঁছে দিতে নতুন মোটরসাইকেল দেওয়া হয় উঠতি বখাটে কিশোর-তরুণদের। আধিপত্যের দ্বন্দ্বে প্রায়ই এলাকায় খুনাখুনি ঘটে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের ১৭ মামলায় ৫৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের অনেকে দীর্ঘদিন বস্তিতে আত্মগোপনে থাকেন। এ ছাড়া ২৫৭ মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হন ৩৫৭ জন। জানা যায়, ৮ আগস্ট মিয়াপাড়া থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ নাসির উদ্দিন সেন্টুকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। তিনি কক্সবাজার থেকে ইয়াবা চালান এনে খুলনায় বিক্রি করতেন। বস্তি এলাকায় থেকে সুন্দরী তরুণীদের সহায়তায় সিন্ডিকেট পরিচালনা করতেন। অভিযানে তার স্ত্রীসহ কক্সবাজারের আরও দুই তরুণী গ্রেপ্তার হন।
এদিকে গতকাল কেডিএ অ্যাভিনিউতে মাদক-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ-উজ্জামানের সভাপতিত্বে প্রতিবাদসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় মাদক কারবারিরা সংগঠিত হয়ে উঠছে।’ তিনি এ বিষয়ে প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
মেট্রোপলিটন পুলিশের তালিকায় মহানগরীতে ৫৮৪ মাদক কারবারির নাম রয়েছে। যাদের অধিকাংশ বিভিন্ন বস্তি এলাকার বাসিন্দা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে তথ্যমতে বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় খুলনা বিভাগে মাদকসংক্রান্ত প্রায় ৮ হাজার মামলা ঝুলে আছে। অনেক আসামি জামিনে বেরিয়ে পুনরায় একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। মেট্রোপলিটন পুলিশের ডেপুটি পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১ জুন থেকে অস্ত্রধারী অপরাধী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে সমন্বিত বিশেষ অভিযান চলছে।’