সিলেট সীমান্তের তিন দিকে ভারত। একদিকে ভারতের মেঘালয়, অন্যদিকে আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্য। বিভাগের চার জেলার সঙ্গে ভারতের রয়েছে প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত। নদী ও পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম এই সীমান্ত এলাকাকে মাদক ও চোরাচালানের নিরাপদ করিডর হিসেবে বেছে নিয়েছে চোরাকারবারিরা। অধিক লাভজনক হওয়ায় মাদক চোরাচালানের এই নেটওয়ার্কে জড়িয়েছেন অনেক জনপ্রতিনিধি। ইয়াবার আরেক রুটে পরিণত হয়েছে সিলেটের সীমান্তবর্তী অঞ্চল। মাদকের কারবার করে অনেকেই অল্প সময়ে আঙুল ফুলে কলা গাছ হয়েছেন। রাতারাতি ‘বড়লোক’ হওয়ার এই জোয়ারে ভেসে দিনদিন বাড়ছে মাদক কারবারির সংখ্যা। সীমান্তরক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে যারা মাদকসহ ধরা পড়েন তাদের বেশির ভাগই বাহক বা ‘ক্যারিয়ার’। মূলহোতা বা পুঁজি বিনিয়োগকারীরা নিরাপদে থেকে যাওয়ায় বাহক ধরা পড়লেও থামে না মাদকের কারবার। মাদকসহ যারা ধরা পড়েন তাদের কয়েক দিনের মধ্যে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বের করে নিয়ে আসে চক্রের হোতারা। আর জেল থেকে বের হয়েই তারা আবারও জড়িয়ে পড়ে মাদক কারবারে। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সীমান্ত অঞ্চলের লোকজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।


সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ৬টি ভারত সীমান্তঘেঁষা। এর মধ্যে জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা ভারতের মেঘালয় এবং জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজারের ওপারে আসাম রাজ্য। এই উপজেলাগুলোর অন্তত ১০০ স্পট  চোরাকারবারিরা তাদের নিরাপদ করিডর হিসেবে বেছে নিয়েছে। নিত্যপণ্য থেকে শুরু করে প্রসাধনীসামগ্রী, গরু, মহিষ, ভেড়া, অস্ত্র ও মাদক আসছে বেশির ভাগ স্পট দিয়ে। এর মধ্যে প্রায় প্রতিটি স্পট দিয়েই আসে মাদক। ভারত থেকে আসা মাদকের মধ্যে রয়েছে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও অফিসার্স চয়েজ মদ। ভারতের আসাম রাজ্যঘেঁষা জকিগঞ্জ, কানাইঘাট ও বিয়ানীবাজার সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা ও ফেনসিডিল এবং মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা জৈন্তাপুর, গোয়াইনঘাট ও  কোম্পানীগঞ্জ দিয়ে ফেনসিডিল এবং অফিসার্স চয়েজসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ আসে।


সীমান্ত পেরিয়ে ভারত থেকে যেসব মাদক আসে এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ইয়াবা আসে জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীবেষ্টিত এই উপজেলা এখন ইয়াবা চোরাচালানের অন্যতম রুট। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার চালান ভারতের বিভিন্ন রাজ্য পেরিয়ে জকিগঞ্জে প্রবেশ করে। আসাম ও জকিগঞ্জের কারবারিরা মিলে এই উপজেলার সীমান্তে বেশ কয়েকটি স্পট তৈরি করেছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নদী পেরিয়ে ইয়াবার চালান জকিগঞ্জে আসার পর প্রথমে স্থানীয়ভাবে সেগুলো মজুত করা হয়। এরপর সুযোগ বুঝে জকিগঞ্জ- শেওলা জিরো পয়েন্ট, জকিগঞ্জ-আটগ্রাম, জকিগঞ্জ-কালিগঞ্জ সড়ক ব্যবহার করে ক্যারিয়ারের মাধ্যমে সিলেট শহরে পাঠানো হয়। সীমান্ত দিয়ে মাদক আনার জন্য সীমান্তের দুই পাড়ে কারবারিদের নিজস্ব লাইনম্যান রয়েছে। রাতে যে স্থানে বিজিবি ও বিএসএফের টহল শিথিল থাকে সেই পয়েন্ট দিয়েই আনা হয় মাদকের চালান।


সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান ও মাদক আসা প্রসঙ্গে জানতে বিজিবি সিলেট সেক্টর কমান্ডার কর্নেল সালাহউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালে তিনি ব্যাটালিয়ন কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। কিন্তু ১৯ ও ৪৮ ব্যাটালিয়ন কমান্ডের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাদের বক্তব্য মিলেনি।


সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) মিডিয়া অফিসার, অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. মনজুরুল আলম জানান, মাদকসেবী ও কারবারিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চলছে। এসএমপির আওতাধীন ছয় থানায় মাদকবিরোধী র‌্যালি হচ্ছে। মাদক কারবারিদের তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাই চলছে। তালিকা প্রস্তুত করে শিগগির অভিযান শুরু হবে।


সিলেট জেলা পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তালিকা করে বিশেষ অভিযানেরও পরিকল্পনা রয়েছে।