বেড়েই চলছে মামলাজট। সরকার ও সুপ্রিম কোর্টের নানা ধরনের উদ্যোগের পরও এর লাগাম টানা যাচ্ছে না। ২০০৭ সালের ১ নভেম্বর ১৫ লাখ ৭০ হাজার মামলা নিয়ে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হওয়া বিচার বিভাগে বর্তমানে বিচারাধীন মামলা ৪৭ লাখ ৪২ হাজার। শুধু গত এক বছরেই এই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ২ লাখ ২৫ হাজার মামলা। সুপ্রিম কোর্টের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, বিচারাধীন মামলা লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। মামলাজটের কারণে একদিকে যেমন বিচারপ্রার্থীদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে বিচারে বিলম্বের কারণে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। তাই এখনই মহাপরিকল্পনা করে পাহাড়সম এই মামলার জট নিরসন করতে হবে বলে তাদের মত।
বিচার বিভাগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মামলা নিষ্পত্তির তুলনায় দায়েরের সংখ্যা বেশি হওয়ায় জট বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা কম থাকায় নিষ্পত্তিও বাড়ছে না। বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে মামলাজট নিরসনে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এর আগে আইন কমিশনও বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছিল। দুই কমিশনের সুপারিশেই বিচারক বৃদ্ধির তাগিদ দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের বিবরণী শাখার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছর ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৪২ হাজার ৭৩১টি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে ৪০ লাখ ৪১ হাজার ৯২৪টি মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৪১ হাজার ৫৫১টি এবং হাই কোর্ট বিভাগে ৬ লাখ ৫৯ হাজার ২৫৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে গত বছর ১ জানুয়ারি দেশে বিচারাধীন মামলা ছিল ৪৫ লাখ ১৭ হাজার ২০১টি। ওই সময় অধস্তন আদালতে ৩৮ লাখ ৯৬ হাজার ৪৩০টি, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ৩১ হাজার ১২০টি এবং হাই কোর্ট বিভাগে পাঁচ লাখ ৮৯ হাজার ৬৫১টি মামলা বিচারাধীন ছিল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে গত এক বছরেই জটের তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ৫৩০ মামলা। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে এক লাখ ৪৫ হাজার ৪৯৪টি, আপিল বিভাগে ১০ হাজার ৪৩১টি এবং হাই কোর্ট বিভাগে ৬৯ হাজার ৬০৫টি মামলা মামলাজটে নতুন যুক্ত হয়েছে।
বিচারক বৃদ্ধির তাগিদ দুই সুপারিশে : তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ আদালতে বর্তমানে ১০৮ জন বিচারপতি রয়েছেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগে পাঁচজন এবং হাই কোর্ট বিভাগে ১০৩ জন। এ ছাড়া অধস্তন আদালতে কর্মরত আছেন ২ হাজার ৩৪১ জন বিচারক। তবে এই সংখ্যাকে অপ্রতুল বলছেন সংশ্লিষ্টরা। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের দেওয়া ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে মামলাজট কমানোসহ ৩২ বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানের নেতৃত্বে গঠন করা বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশে মামলাজট নিরসনের বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়াসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। অধস্তন আদালতের বিচারক সংখ্যা অন্তত ৬ হাজারে উন্নীত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে সুপারিশে।
এর আগে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি ও জট কমিয়ে আনতে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট একটি প্রতিবেদন দেয় আইন কমিশন। প্রতিবেদনে ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে জটের মূল পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। সেগুলো হচ্ছে- পর্যাপ্ত বিচারক না থাকা, বিশেষায়িত আদালতে পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ না হওয়া, মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, জনবলের অভাব এবং দুর্বল অবকাঠামো। আইন কমিশনের এ প্রতিবেদনেও মামলাজট নিরসরে অধস্তন আদালতের বিচারক সংখ্যা পর্যায়ক্রমে ৫ হাজারে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
যা বললেন আইনজ্ঞরা : মামলাজটের বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম মাহবুব উদ্দিন খোকন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, মামলাজট বিচার বিভাগের জন্য একটি বড় সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে বার এবং বেঞ্চকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রধান বিচারপতিকে আরও বেশি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনস্বার্থ মামলার আইনজীবী খ্যাত সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, শুধু পরিকল্পনা নয়, মহাপরিকল্পনা করে মামলাজট বৃদ্ধির প্রধান দুই কারণ নিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের মামলাজট বাড়ার প্রধান দুই কারণ। একটি হচ্ছে আমরা মামলা দায়েরও ঠেকাতে পারছি না, অন্যটি দ্রুত নিষ্পত্তিও করতে পারছি না। সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী বলেন, মূল কাজটা না করে মুখে যদি বলতে থাকি মামলাজট কমাতে হবে, তাহলে এটা কোনো সমাধান নয়। তার মতে, মামলাজটের লাগাম টানতে হলে বিচারকের সংখ্যা অন্তত তিন গুণ বৃদ্ধি করতে হবে, লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মামলার উৎপাদন কমানোর বিষয়ে জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।