রাজধানীর কয়েক শ স্পটে চলছে মাদক কারবার। এর বেশির ভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। তাদের হাতে রয়েছে অবৈধ পিস্তল, রিভলভারসহ ধারালো অস্ত্র। সর্বশেষ গত সোমবার অভিযানে গিয়ে খিলগাঁও অঞ্চলের পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান কিশোর গ্যাং সদস্যের দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এ হামলার ঘটনায় কিশোর গ্যাং সদস্যরা জড়িত। তাদের হাতে অবৈধ অগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। এ কারণে তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মাদক কারবারিদের তালিকা ধরে অভিযান শুরু করার পর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা হামলার শিকার হতে শুরু করেন। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে কিশোর গ্যাং সদস্যরা গুলিও করছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, কর্মকর্তা সিদ্দিকুর রহমান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এরই মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খুঁজছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে কিশোর গ্যাং ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে আরো কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
এই কর্মকর্তা ছাড়াও সাম্প্রতিক অভিযানে আরো বেশ কজন কর্মকর্তা হামলার শিকার হয়েছেন। প্রতিটি হামলার ঘটনায় কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা রয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মুকুল জতি চাকমা বলেন, ‘মাদক পুরো সমাজকে শেষ করে দিচ্ছে। এখন শিক্ষার্থীরাও মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অপরাধীদের ধরতে গিয়ে আমরা হামলার শিকার হচ্ছি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা অনেকটা নিরস্ত্র অবস্থায় অভিযান চালাচ্ছি। তবে মাদক প্রতিরোধে শিগগিরই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ে অস্ত্র দেওয়া হবে। এরই মধ্যে অস্ত্রের ধরন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো কমিটির মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে।’
গত রবিবার বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। তাতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছে, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, মাদক ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ কিশোর-তরুণ। শীর্ষ কারবারিদের হাত ধরে বর্তমানে রাজধানীসহ সারা দেশে কিশোর গ্যাং সদস্যরা মাঠ পর্যায়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ করছে। তাদের হাতে রয়েছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সেই সঙ্গে ধারালো অস্ত্রও তারা সঙ্গে রাখে। মাদক কারবারে বাধা পেলে তারা খুনাখুনিতে জড়ায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্র বলছে, গত সোমবার যাত্রাবাড়ীর সায়েদাবাদ রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় অভিযানের সময় সিদ্দিকুর রহমানকে রিভলভার দিয়ে গুলি করলে
তাঁকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র চেয়ে আসছে জানিয়ে সূত্র বলছে, অস্ত্র ছাড়া জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্তমানে তাঁরা মাদক উদ্ধারে অভিযান চালাচ্ছেন। তাই এই বাহিনী অস্ত্র চায়। মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ে কাজ করা এসআই, সিপাহি ও পরিদর্শকদের অস্ত্র দেওয়ার বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ওয়ারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মফিজুর রহমান বলেন, ‘যাত্রাবাড়ির সায়েদাবাদ রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদক উদ্ধারে অভিযানের সময় সন্দেহভাজন একজনকে আটক করে তার শরীর তল্লাশি চালানোর সময় ওই কর্মকর্তাকে গুলি করে পালিয়ে যায় আটক ব্যক্তি। এ সময় ওই দুর্বৃত্ত তার রিভলবারটি সেখানে ফেলে যায়।’
আরো যাঁরা হতাহত : ডিএনসি কর্মকর্তা জানান, খুচরা বাজারে মাদক বিক্রির টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে খুনাখুনির ঘটনাও ঘটছে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যই নয়, মাদক কারবারে বাধা দিয়ে হত্যার শিকার হচ্ছে অনেকে। গত ২ মার্চ গাজীপুরের শ্রীপুরে মাদক ব্যবসায় বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে আকরাম হোসেন নামে এক নির্মাণ শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৭ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার বুড়িচঙে রমিজ উদ্দিন নামে একজনকে ছুরি মেরে হত্যা করা হয়।
সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে ডিএনসি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সূত্র বলছে, বর্তমান তরুণসমাজ ব্যাপকভাবে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করছে। এ ক্ষেত্রে মাদককে তারা আড্ডার প্রধান উপকরণ হিসেবে বেছে নিয়েছে। হেরোইন, আইচ, কুশসহ আরো বেশ কটি বিদেশি মাদকে দেশের তরুণসমাজ আসক্ত হয়ে পড়েছে। এখন দামি মাদকে আসক্তি বাড়াতে মাদকচক্র দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করেছে।
অভিযানে ধরাপড়া বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যা বলেছেন :
ডিএনসি সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে মাদক অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও রয়েছেন। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে মাদকের একটি বড় চালান জব্দ করে চারজনকে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি। তাঁরা হলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী খন্দকার তৌকিরুল কবির তামিম, মেহেদী হাসান রাকিব, আশরাফুল ইসলাম ও মাসফিকুর রহমান। বিদেশ থেকে এমডিএমবি নামে মাদকের বড় চালান দেশে এনে ধরা পড়েন তাঁরা। এই চক্রটি গোপনে ফেসবুক ও হোয়াটঅ্যাপ ব্যবহার করত। এরা ফেসবুকের ক্লোজড গ্রুপ, রিভিউ পেজ ও ভুয়া অ্যাকাউন্টে সংকেতপূর্ণ পোস্ট দিয়ে মাদক বিক্রি করত। আগ্রহী ক্রেতারা ইনবক্সে মেসেজ করলে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে দাম নির্ধারণের পাশাপাশি সরবরাহ নিশ্চিত হতো। অবস্থান শেয়ার, লাইভ ট্র্যাকিং ও বিশেষ ইমোজি ব্যবহার করে লেনদেন সম্পন্ন হতো, যা দেখে অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারী বুঝত না, এটা মাদক।