কুমিল্লা নগরীর পুরাতন গোমতী নদী। ধর্মসাগরের পর এটি হয়ে উঠতে পারে নগরীর অন্যতম দর্শনীয় স্থান। এই প্রাকৃতিক জলাধার প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাচ্ছে। যার যত ইচ্ছে গিলছে। নদীতে আবর্জনা ফেলে দখল করা হচ্ছে। দখল হওয়া নদীর এ বিশাল এলাকাজুড়ে নির্মিত হয়েছে দোকানপাট ও বহুতল ভবন।
২০২১ সালে একনেক সভায় এখানে হাতিরঝিলের আদলে সৌন্দর্যবর্ধনের প্রকল্প অনুমোদন হয়েছিল। প্রায় ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পটি পাঁচ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। দখলদার উচ্ছেদ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায় কাজটি আটকে আছে বলে জানা গেছে। নগরবাসী এ প্রকল্পটির দ্রুত বাস্তবায়ন চায়।
সূত্র মতে, শহর রক্ষার জন্য ’৬০-এর দশকে এ নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। গতিপথ পরিবর্তনে নগরীর উত্তর প্রান্তে কাপ্তানবাজার থেকে শুভপুর পর্যন্ত নদীটি পুরাতন গোমতী নদী নামে পরিচিতি পায়। এরপর থেকে রাজনৈতিক ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা নদীটি দখল করে নির্মাণ করেন বাড়িঘর ও দোকানপাট। শুভপুর, চাঁনপুর, সুজানগর, গাংচর, টিক্কারচর, গয়ামবাগিচা, মোগলটুলী শাহসুজা মসজিদ রোড, পুরাতন চৌধুরীপাড়া, কাপ্তানবাজার এলাকার মধ্যে পুরাতন গোমতীর দুই পাড়ের প্রায় ২০০ একর সরকারি ভূমি অবৈধ দখলদারদের কবলে রয়েছে। এর মধ্যে ৭ শতাধিক অবৈধ দখলদারের তালিকা করা হয়েছে। দিনদিন দখলদারের সংখ্যা বাড়ছে। ২০০৩ সাল থেকে এসব অবৈধ দখলদারকে ২১ বার উচ্ছেদ নোটিস দেওয়া হয়।
সরেজমিন দেখা যায়, নদীর পারসংলগ্ন অনেক বাসিন্দা নদী ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। কেউ আবর্জনা ফেলে দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কোথাও নদীতে মরা পশু ফেলা হয়েছে, দুর্গন্ধে দম বন্ধ হওয়ার অবস্থা। কোথাও নদী না ডোবা তা বোঝার উপায় নেই। স্যুয়ারেজ লাইন এবং আবর্জনা ফেলায় তা মরা খালে পরিণত হয়েছে। সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছেন বাড়িটা নদীর দিকে বাড়িয়ে নেওয়ার।
স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট কাজী আসিফ আহমেদ বলেন, পুরাতন গোমতী নদী বেদখলের কারণে ৩০০ ফুটের নদী সংকুচিত হয়ে গেছে। বেদখল থেকে উদ্ধার করা অনেক জটিল বিষয়, তবে সরকার উদ্যোগ নিলে তা সম্ভব। হাতিরঝিলের মতো করলে এখানে মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি হবে। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। এতে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপকার হবে।
সাংস্কৃতিক সংগঠক অচিন্ত্য দাস টিটু বলেন, পুরাতন গোমতী কুমিল্লার সম্পদ হতে পারত, অথচ এটা এখন ময়লার ভাগাড় হয়ে গেছে। নদীর দুই পাশে জায়গা দখল হয়ে গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আহসান টিটু বলেন, কুমিল্লা আগামীতে বিভাগীয় শহর হতে যাচ্ছে, মানুষ বাড়ছে। কিন্তু সেই তুলনায় বসবাস উপযোগী নগরী গড়ার উদ্যোগ নেই। পুরাতন গোমতীর এই বেহাল অবস্থা এখানের বাসিন্দা হিসেবে ব্যথিত করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লার সভাপতি বদরুল হুদা জেনু বলেন, নগরীতে বিনোদনের তেমন ব্যবস্থা নেই। পুরাতন গোমতীতে নৌ-ভ্রমণ, বৈকালিক আড্ডা, শিশুদের খেলার ব্যবস্থা ও ভাসমান রেস্তোরাঁ করা যেতে পারে। নদীর মাঝের সড়কের স্থানে উঁচু দৃষ্টিনন্দন ব্রিজ করা যেতে পারে।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মামুন বলেন, পুরাতন গোমতী এলাকায় হাতিরঝিল আদলে অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেটির সামগ্রিকভাবে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন। ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া সংশোধনের জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে আমরা ঠিকাদার নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেব। আশা করছি এটির কাজ দুই মাসের মধ্যে শুরু করতে পারব।