প্রকল্পের নাম ‘সিলেট বন্য প্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্র’। সংরক্ষণকেন্দ্রে নিরাপদেই থাকার কথা পশু-পাখির। এজন্য বড়াই করে নিয়ে আসা হয়েছিল দেশি-বিদেশি ১১ প্রজাতির ৮৮টি প্রাণী। কিন্তু সেখানে প্রাণীগুলোর যত্নআত্তি হয়নি, বংশবিস্তারও হয়নি। বরং ১০ বছরে বেঘোরে মারা পড়েছে ৭৩টি। এখন সাকল্যে কোনো রকমে বেঁচে আছে ছয় প্রজাতির ১৫টি পশু ও পাখি। বিশেষজ্ঞরা এজন্য অপরিকল্পিতভাবে বিদেশি পশু-পাখি সংরক্ষণ ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। ২০০৬ সালে ১১২ একর জায়গা নিয়ে সিলেট নগরের টিলাগড়ে গড়ে তোলা হয় ‘টিলাগড় ইকোপার্ক’। ঘনসবুজে আচ্ছাদিত এই বনে রয়েছে নানা জাতের বৃক্ষরাজি। বনটিতে একসময় উড়ে বেড়াতো বনমোরগ, ময়না, টিয়া, ঘুঘু, মানিকজোড়, কালিম, কাঠঠোকরা, হুতুমপেঁচাসহ বিভিন্ন জাতের পাখি। দেখা মিলত বানর, শূকর, খ্যাঁকশিয়াল, বনবিড়াল, মেছোবাঘ, খরগোশ, কাঠবিড়ালি ও বেজির। নানা জাতের সরীসৃপেরও অভয়ারণ্য ছিল ইকোপার্কটি। ২০১৮ সালে ইকোপার্কটিতে ‘বন্য প্রাণী সংরক্ষণ কেন্দ্র’ নামে গড়ে তোলা হয় মিনি চিড়িয়াখানা। ওই বছরের অক্টোবরে গাজীপুর সাফারি পার্ক থেকে আনা হয় ১১ প্রজাতির ৮৮টি প্রাণী। এর মধ্যে ছিল ৯টি হরিণ, ১৮টি কইকার্প, ২টি গ্রে প্যারট, ৪টি খরগোশ, লাভবার্ড ৩০টি, ময়ূর ১২টি, জেব্রা ২টি, সিলভার ফিজেন্ট ৩টি, গোল্ডেন ফিজেন্ট ১টি, সানকনুর ৪টি ও মেকাউ ৩টি। বিদেশি পশুপাখি আনা হলেও সংরক্ষণকেন্দ্রটিতে কোনো ভেটেরিনারি চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে বছর ঘোরার আগেই শুরু হয় পশু-পাখির মৃত্যুর ঘটনা। এ মৃত্যুর কারণ হিসেবে অবশ্য সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান জানান, শব্দদূষণ এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা ও গরম সহ্য করতে না পারায় প্রাণীগুলো মারা গেছে। গত এক বছরে অন্তত ১০টি হরিণ, ২টি গ্রে প্যারট, ১টি ময়ূর, ৬টি রঙিন কার্প ও ২টি কালিম মারা গেছে। বর্তমানে সংরক্ষণ কেন্দ্রে রয়েছে ৬-৮টি হরিণ, গ্রে প্যারট ২টি, ময়ূর ২টি, সিলভার ফিজেন্ট ১টি, মেকাউ ৩টি ও অজগর সাপ ১টি। অভিযোগ রয়েছে মারা যাওয়া ছাড়াও সংরক্ষণকেন্দ্র থেকে হরিণ চুরিও হয়েছে।
সরেজমিন সিলেট বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রে ঢুকতেই চোখে পড়ে অনিয়মের চিত্র। বনবিভাগের ইজারাদার মেসার্স জালাল এন্টারপ্রাইজ দর্শনার্থী ফি ২৩ টাকার পরিবর্তে আদায় করছেন ৩০ টাকা। বাড়তি টাকা নেওয়ার ব্যাপারে কোনো সদুত্তর নেই তাদের। বাড়তি ফি নেওয়া দুঃখজনক মন্তব্য করলেও বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুর রহমানের কাছ থেকে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো আশ্বাস মিলেনি। ভিতরে ঢুকতেই দেখা যায়, মেকাও, সিলভার ফিজেন্ট ও গ্রে প্যারটের খাঁচার ভিতর জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। মেকাও ও গ্রে প্যারটের খাঁচার ভিতর ঘুরে বেড়াচ্ছে কাঠবিড়ালি। মাঝে মধ্যে পাখিগুলোর দিকে কাঠবিড়ালি তেড়ে আসছে। ভয়ে খাঁচাজুড়ে উড়ছে পাখিগুলো। ময়ূর ও অজগরের খাঁচার ভিতরের পরিবেশ আরও অপরিচ্ছন্ন। বন কর্মকর্তা আবদুর রহমান মন্তব্য করেন, যারা বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকেন্দ্রটি স্থাপন করেছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের অভাব ছিল। প্রাণীগুলোর বেষ্টনী সুচিন্তিতভাবে করা হয়নি। স্থানটিও বন্য প্রাণী সংরক্ষণের জন্য উপযুক্ত ছিল না। বর্তমানে সংরক্ষণকেন্দ্রের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান হয়েছে। মাস্টারপ্ল্যানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী বন্যপ্রাণীকেন্দ্রের পাশে ১০ একর ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণ করা হবে। পরে প্রাণীগুলোকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি আশা করেন, এতে পশু-পাখির মৃত্যু হার কমবে।