শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) একের পর এক শিক্ষার্থীর অকালমৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো ক্যাম্পাসে। চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সাত শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজন পানিতে ডুবে, দুজন সড়ক দুর্ঘটনায়, একজন অসুস্থ হয়ে এবং অন্যজন বিষপানে মারা গেছেন। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় শোকাহত সহপাঠী, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষার্থীরা।
বিষপানে মৃত্যু বাঁধনের
প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে কীটনাশক পান করে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার বাঁধন (২১)। গত ৪ অক্টোবর রাতে বিষপানের পর তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। নয় দিন পর সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বেলা ৩টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন রসায়ন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. ইকবাল আহমেদ সিদ্দিকী। বাঁধনের স্থায়ী বাড়ি চুয়াডাঙ্গা জেলায়।
অসুস্থ হয়ে মারা যায় জিসান
গত সোমবার (১২ অক্টোবর) অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম ন্যাশনাল হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ জিসান হাসান। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যায় সাদমানের
গত শনিবার (১০ অক্টোবর) মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা যান পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাদমান রহমান। শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়কে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন তপোবন আবাসিক এলাকার সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
সাদমানের বাড়ি রাজবাড়ীর মধ্য ভবানীপুর এলাকায়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন টিলারগাঁও এলাকার একটি মেসে থাকতেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা শেষে মোটরসাইকেলে করে মদিনা মার্কেট এলাকার দিকে যাচ্ছিলেন সাদমান। পথে গতিরোধকের কাছে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক বিভাজকে ধাক্কা লাগে। পরে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান রতন
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাকিবুল ইসলাম রতন।
সুইমিংপুলে প্রাণ গেল দীপাঞ্জনের
গত ১৬ সেপ্টেম্বর সিলেট নগরের চৌকিদিখি এলাকার ব্রিটানিয়া সুইমিংপুলে সাঁতার কাটতে গিয়ে মারা যান কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী দীপাঞ্জন ঘোষ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সহপাঠীদের সূত্রে জানা যায়, ওই দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৬টার দিকে সুইমিংপুলে সাঁতার কাটার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পরে সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে নগরের দরগাহ গেট এলাকার নূরজাহান হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
বিছানাকান্দির স্রোতে তলিয়ে যান শান্ত
গত ১৫ মে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দিতে ঘুরতে গিয়ে পানিতে ডুবে মারা যান পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শান্ত বণিক (২২)। তাঁর বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার লাহিড়ী বাজার এলাকায়।
ঘটনার দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তিন বন্ধু মিলে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী নোম্যান্সল্যান্ডসংলগ্ন জলাশয়ে গোসল করতে নামেন। একপর্যায়ে পানির তীব্র স্রোত ও গভীরতায় তলিয়ে যান শান্ত। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পরে রাত সাড়ে ৯টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে।
লালাখালে প্রাণ হারান মুসআব আমীন
চলতি বছরের শুরুতেই শাবিপ্রবিতে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের লালাখালে ঘুরতে গিয়ে গোসল করতে নেমে মারা যান তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মুসআব আমীন। তিনি সাঁতার জানতেন না। মুসআব আমীন ও শান্ত বণিক দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ মুজতবা আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ছিলেন।
দশ মাসে সাত শিক্ষার্থীকে হারিয়ে শোকাহত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এসব ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘প্রতিটি ঘটনায় আমরা শিক্ষার্থীদের বাঁচানোর জন্য দ্রুত সাড়া দিয়েছি। কিন্তু মৃত্যু অনিশ্চিত। একের পর এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। অদম্য মেধাবীদের হারানো শাবিপ্রবির অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা তাঁদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহপাঠী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।’