ভারতের রাজধানী দিল্লি গতকাল প্রায় চার স্তরবিশিষ্ট দুর্গে পরিণত হয়েছিল। আর এ দুর্গ রক্ষায় প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিল পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর ২৫ হাজারেরও বেশি সদস্য। শুধু তাই নয়, বাতিল করা হয়েছিল একাধিক ট্রেন, বন্ধ রাখা হয়েছিল অন্তত ৪৫টি মেট্রো স্টেশন। বেশ কিছু নির্ধারিত এলাকার ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ এদিন দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে রাজধানী দিল্লিতে বড় আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল বিরোধী দল ও তরুণদের রাজনৈতিক দল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। পরিস্থিতি সামাল দিতে শুধু দিল্লিতেই এদিন আটক করা হয় চার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, সিজেপির শীর্ষ নেতা, বিরোধী রাজনীতিক, আন্দোলনকর্মী, কনটেন্ট নির্মাতা, সাংবাদিকসহ প্রায় ৬ হাজার মানুষকে। সব মিলিয়ে গতকাল দিনভর দিল্লির পরিস্থিতি ছিল খুবই উত্তাল।


আটকদের মধ্যে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি, কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন ও ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকারকে পরে ছেড়ে দেওয়া হলেও সিজেপির কাউকে ছাড়া হয়নি। আটকদের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল অন্তত ১০টি ্েস্টডিয়াম। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত তাদের সেখানেই রাখা হয়েছিল।


সিইসির পদত্যাগ দাবিতে দিল্লির যন্তরমন্তরে পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে গতকাল বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হয়, চালানো হয় গণগ্রেপ্তার। পুলিশের দাবি, গতকাল সকালে যন্তরমন্তরের দিকে যাওয়ার পথে অন্তত ২০০ জনকে আটক করার পর আন্দোলনকারীরা সমর্থকদের দিল্লি হাট এলাকায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান। সেখান থেকে মিছিলের নেতৃত্ব দেন নেহা বোরা ও যোগেন্দ্র যাদব। আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও সেখানে ছিলেন। পরে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমও জানিয়েছে, বিক্ষোভের আগের রাতেই অন্তত ১ হাজার ২০০ জনকে আটক করা হয়েছিল। এ ছাড়াও গতকাল সারা দিনে দিল্লিজুড়ে ৬ হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ। আটকদের মধ্যে সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্কসবাদী) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, নেতা এমভি গোবিন্দন মাস্টার, এ বিজয়রাঘবন, কে কে শৈলজা, জন ব্রিটাস, কে এন বালাগোপাল, বৃন্দা কারাত, অধিকারকর্মী যোগেন্দ্র যাদব, অভিনেতা ইমরান খান, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরা। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।


এর আগে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের ভিতর থেকেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাকে আটক করে পুলিশ। এ ছাড়াও সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিংকে আটক করা হয়। শীর্ষ নেতাদের আটকের কয়েক ঘণ্টা পরই অজিঙ্কা শিন্ডেকে সিজেপির নতুন নেতা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। নেতৃত্ব পেয়েই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘এ সরকার ভয় পেয়ে গেছে। এ কারণেই তারা পুরো দিল্লি বন্ধ করে দিয়েছে। যেখানেই পুলিশ আটকাচ্ছে সেখানেই আপনারা যন্তরমন্তর বানান। যতক্ষণ জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করছেন ততক্ষণ এ লড়াই চলবে।’


প্রতিবাদ ছড়াচ্ছে ভারতের বিভিন্ন শহরে : দিল্লির প্রতিবাদের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ভারতের অন্যান্য শহরেও। বেঙ্গালুরু, মুম্বাই, চেন্নাই, চণ্ডীগড়, কলকাতা, পাটনা ও হায়দরাবাদে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে। বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবিতে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে মিছিল শুরুর আগেই অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ। মুম্বাইয়ের আগস্ট ক্রান্তি ময়দানেও বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি নজরদারি ও আটকের ঘটনা ঘটে। চেন্নাইয়ে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন (এআইএসএফ) ও অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ ফেডারেশনের (এআইওয়াইএফ) কর্মীরা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন। চণ্ডীগড়ে আম আদমি পার্টি (আপ) ও অন্যান্য দলের পক্ষ থেকে প্রতীকী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হয়। কলকাতার বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সংহতি মিছিলের ডাক দিয়েছেন। এ ছাড়া পাটনা ও হায়দরাবাদেও ছাত্র সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচির খবর পাওয়া গেছে।


আটক সবাইকে মুক্তি না দিলে অনশন করবেন সোনম ওয়াংচুক : বিক্ষোভ ঘিরে আটক সবাইকে আগামীকালের মধ্যে মুক্তি দেওয়া না হলে অনশন করবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক। ম্যাগসাইসাই পুরস্কারজয়ী শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক এক এক্স বার্তায় বলেছেন, ‘গতকাল (শুক্রবার) যখন আমি আজকের বিক্ষোভে ঐক্য ও শান্তির জন্য আবেদন জানিয়ে একটি বার্তা পোস্ট করেছিলাম, তখন কল্পনাও করতে পারিনি যে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র একটি অঘোষিত জরুরি অবস্থার মধ্যে পড়বে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনটি পরিচালনার জন্য এত নেতা দেখে খুশি হয়েছিলাম, কিন্তু এখন জানতে পেরেছি যে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমি আশা করি, গ্রেপ্তার সবাইকে শিগগিরই মুক্তি দেওয়া হবে। আগামীকালের মধ্যে তাদের মুক্তি দেওয়া না হলে আমি অনশন বা পদযাত্রা কর্মসূচির কথা বিবেচনা করতে বাধ্য হব।’