দেশজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করা অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের রেশ না কাটতেই ফের একই জেলায় ঘটল আরও এক হত্যাকা । এবারের শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫)। মারা যাওয়ার আগে বাবার কাছে লাইভ লোকেশনও পাঠিয়েছিল তাজমিন; আকুতি জানিয়েছিল তাকে উদ্ধারের। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানখেত থেকে তাজমিনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তাজমিনকে বহনকারী সিএনজি অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চট্টগ্রাম নগরী থেকে গতকাল তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছেন কুমিল্লা পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুজ্জামান। তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পাওয়া যায়। অটোরিকশাটি জব্দ করে সেটির সূত্র ধরে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। নিহত জান্নাতুল যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলিমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাজমিনের বাবা আবদুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা রিজিয়নে চাকরি করছেন। তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। ঘটনার পর নিহত জান্নাতুলের বাবা আবদুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।


পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গ্রেপ্তার সুমনের বাড়ি কুমিল্লার জয়নগর এলাকায়। তিনি বেশির ভাগ সময় রাতে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার ও আশপাশের এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাতেন। তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকতেন। কিছুদিন আগে ঘর বিক্রি করে সেখান থেকে চলে যান।


সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস বলেন, ঘটনার পর থেকে অটোরিকশাচালক সুমন আত্মগোপনে ছিলেন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নেই এবং তিনি মুঠোফোনও ব্যবহার করেন না। এতে ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করতে সময় লাগে। লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, কিশোরীর মৃতদেহ উদ্ধারের পর এ ঘটনায় তার বাবা বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। ওই মামলায় অটো রিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় আমাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের হাতে : এদিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ারবাজার হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামার পর তার চলাচলের সিসিটিভি পুলিশের হাতে রয়েছে। ওই ফুটেজে তাকে কয়েকটি দোকানের দিকে যেতে ও এক দোকানির সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়।


ফুটেজে দেখা যায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক পরিবহনের একটি বাস থেকে পদুয়ারবাজার হোটেল নূরজাহানের সামনে নামে ওই কিশোরী। এরপর হোটেলের পাশের খাবারের দোকান এবং পশ্চিম পাশে কয়েকটি স্টেশনারি দোকানের দিকে যায় সে। একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দোকানির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা যায় তাকে। এ সময় দোকানিকে কিছু একটা দেখাতে বা দিকনির্দেশনা দিতে দেখা যায়।


ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাত ১২টার দিকে দোকানের সামনে কিছু একটা দেখানোর পর কিশোরীটি সেখান থেকে অন্য পাশে যায়। পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে নূরজাহান এলাকা ছেড়ে যেতে দেখা যায়। এরপর সে কোন পথে গেছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। তার চলাচলের পথ ও সম্ভাব্য যাতায়াতের মাধ্যম নিয়ে তদন্ত করছেন সংশ্লিষ্টরা।


নূরজাহান হোটেলের সামনে বাস থেকে নামার পর কিশোরীটি কোথায় গিয়েছিল, কারও সঙ্গে দেখা হয়েছিল কি না এবং লাশ উদ্ধারের স্থান থেকে কিছুটা দূরে পাওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।


ধানখেতে দৌড়াদৌড়ি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন : বৃহস্পতিবার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে কিশোরীটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থলের অন্তত চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো অবস্থায় দেখা যায়। পাশেই পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা।


স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে সিএনজিটির ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখতে পান। আশপাশের ধানখেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্ন দেখে সেদিকে এগিয়ে গেলে একটি ধানখেতে কিশোরীর লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। লাশের মাথা কাদায় গোঁজা ছিল এবং গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।


নিহত কিশোরীর বাবা আবদুল আলীম বলেন, ৪ অক্টোবর কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয় তার মেয়ে। পরে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে যায়। বুধবার রাতে কুমিল্লার উদ্দেশে বাসে রওনা দেয় সে। রাতে মেয়েকে একাধিকবার ফোন করলেও রিসিভ হয়নি। বুধবার রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে তার মেয়ে মোবাইল ফোনে মেসেজ ও লাইভ লোকেশন পাঠায়। মেসেজে তাকে এসে নিয়ে যেতে বলে। তিনি বলেন, তখন আমি ঘুমে ছিলাম।


তাজমিনের স্কুল ফরিদা বিদ্যায়তনের প্রধান শিক্ষক আবু হানিফ মজুমদার বলেন, সে আমাদের স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে সে আর স্কুলে আসেনি।