সরকার পরিচালনায় দেড় বছর সময় পেয়েছিল নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময়ের অব্যবস্থাপনা এবং ব্যর্থতার দায় বর্তেছে বর্তমান সরকারের ঘাড়ে। শিশুর টিকাদান থেকে শুরু করে, জ্বালানি খাতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ নেমে গেছে তলানিতে। ব্যবসাবাণিজ্যে চলছে স্থবিরতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার পরিচালনায় যে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম ছিল অযথা হস্তক্ষেপ করে সেটিকেই ভেঙে দিয়ে গেছে অন্তর্বর্তী সরকার।


সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এবং প্রশাসনিক কাঠামোতে এমন একটি বিশৃঙ্খলায় ফেলে রেখে গেছে, যেটি সিস্টেমে আনতে বেগ পেতে হচ্ছে নির্বাচিত সরকারকে। গভীর অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য খাতের বিশৃৃঙ্খলা, ব্যাংক খাতের অস্থিরতা, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতা, জ্বালানি খাতের অব্যবস্থাপনা সামাল দিতে গিয়ে বর্তমান সরকারের সামনে এখন অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার কঙ্কালটি প্রকাশ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে,       জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারের অব্যবস্থাপনার মর্মান্তিক পরিণতি হচ্ছে হামের ভয়াবহ প্রকোপ। এর ফলে হাসপাতালে শিশু মারা যাচ্ছে। অসহায় মা-বাবা বুঝতেই পারছেন না তারা কী করবেন। শুধু হাম নয়, পোলিও, যক্ষ্মা, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হাম-রুবেলা ও হেপাটাইটিস বি রোগ প্রতিরোধের জন্য যেসব টিকা দেওয়া হয় সেগুলোর সংকট রয়েছে বলে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে খবর আসছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যে কর্মসূচি অপারেশনাল প্ল্যান বা ওপির আওতায় টিকা কেনা হতো, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেটি ২০২৫ সালের আগস্টে বাতিল করে দেওয়া হয়। ফলে টিকা কার্যক্রম সংকটে পড়ে।


স্বাস্থ্য খাতের মতো জ্বালানি খাতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। গত জানুয়ারিতে দেশে এলপিজি গ্যাসের ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়। ১৩০০ টাকার গ্যাস সিলিন্ডার দাম বেড়ে ১৭০০ থেকে আড়াই হাজার টাকায় উঠে যায়। একপর্যায়ে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ করে দেয় পরিবেশকরা। গ্যাসের বিপর্যয় সামাল দেওয়ার আগে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বর্তমান সরকারের সামনে তৈরি হয়েছে জ্বালানি তেলের সংকট। শুধু যে শিল্প-কারখানা জ্বালানি পাচ্ছে না তা নয়, সাধারণ যাবাহনও ভুগছে জ্বালানি সংকটে। জ্বালানির অভাবে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো পুরো উৎপাদনে যেতে পারছে না। এমনকি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পর জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশা পূরণে অন্তর্বর্তী সরকারের সদিচ্ছার অভাব ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, প্রশাসনে রদবদল নিয়ে সমন্বয়হীনতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতির কারণে দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে নির্বাচিত সরকারের কাজকর্মে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সিটি করপোরেশনের শীর্ষ পদে অদক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়ায় পরিকল্পিত কাজ হয়নি। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই মশার প্রকোপ বেড়েছে রাজধানীতে। রাজস্ব প্রশাসনে সংস্কার করতে গিয়ে সেখানেও হযবরল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংস্কার নিয়ে আন্দোলনের জের ধরে একের পর এক কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করা হয়। এতে করে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় রাজস্ব প্রশাসনে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে রাজস্ব আয়ে। সরকারের আয় কমে যাওয়ায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে ও অনুন্নয়ন ব্যয় সামাল দিতে কোটি কোটি টাকা ঋণগ্রহণ করতে হয় ইউনূস সরকারকে। সেই ঋণের বোঝা বর্তেছে বর্তমান সরকারের ঘাড়ে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর রাষ্ট্রীয় ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। যদিও তাদের ১৮ মাসে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ঋণগ্রহণ বেড়েছে। সব মিলিয়ে ইউনূস সরকারের নেওয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকায়। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। সরকারের আয় কমলেও আসছে বাজেটে এসব ঋণের পরিশোধের চাপ পড়বে বর্তমান সরকারের ঘাড়ে। সংশ্লিষ্টরা জানান, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার শিল্প-বাণিজ্যের গলা টিপে ধরে। লাগামহীন দ্রব্যমূল্য, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ডলার সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ছিল স্পষ্ট। আমানতকারীদের স্বার্থের কথা না ভেবে, কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এসব ব্যাংকের সাধারণ শেয়ারধারীদের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে। ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা সংকট সমাধানে বারবার অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাতে কান দেয়নি কেউ। বরং ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে, এলসি সুবিধা বন্ধ করে দিয়ে নানাভাবে হয়রানি করেছে ইউনূস সরকারের প্রশাসন। অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর গতকাল ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় বলেন, দেশে বিনিয়োগ কম এবং মূল্যস্ফীতি সেভাবে কমেনি, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামষ্টিক অর্থনীতির অনেক সূচকই খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। আমাদের কর্মসংস্থান কমছে, বিনিয়োগ কমছে, রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কমছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য সংকট।