চট্টগ্রাম ও আশপাশের তিন জেলায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা টানা বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার পানি পুরোপুরি নামার আগেই লঘুচাপের কারণে নতুন করে জনমনে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে। এ কারণেই নতুন করে আবহাওয়া পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অপরদিকে, দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যার পানি বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-
চট্টগ্রাম : আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় একটি লঘুচাপের সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পায়রা ও মোংলা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।
এদিকে গতকাল বন্যা পরিস্থিতির ক্রমেই উন্নতি অব্যাহত ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো থেকে পানি আগের চেয়ে অনেকটাই কমে এসেছে। গ্রামীণ সড়কগুলো থেকে পানি সরে যাওয়ায় বাসাবাড়িতে আটকে থাকা মানুষ কোথাও কোথাও বের হতে পারছেন। তাবে অনেক এলাকার সড়ক ও ব্রিজ-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে।
রাঙামাটি : সম্প্রতি টানা প্রবল বর্ষণে আকস্মিক বন্যাসহ রাঙামাটিতে বিভিন্ন উপজেলায় ১৩৫ স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে। এ ছাড়া বন্যাকবলিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭ হাজার ৬৪৬ পরিবার, যার লোকসংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। এদিকে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতি হলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। তবে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় আশ্রিত লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজেদের বাড়িঘরে চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন নাজমা আশরাফী। রাঙামাটি জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, রাঙামাটি সদর, বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়িতে একজন করে পাহাড়ি ঢলে নিখোঁজ হওয়া তিনজনের লাশ ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে।
পাহাড়ধসের ঝুঁকি ও বন্যাসহ দুর্যোগকবলিত হয়ে সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় ৪৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয়ে ছিলেন ৩ হাজার ৪৮৭ জন। তবে গত সোমবার থেকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র থেকে নিজেদের বাড়িঘরে ফিরছেন।
কক্সবাজার : টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও বন্যায় কক্সবাজারের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দুর্যোগে ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩ জন। এদিকে পানি নামতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো জলাবদ্ধতা, ভাঙাচোরা সড়ক, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ দেখা যাচ্ছে। চকরিয়ার দুর্গম বমু বিলছড়ি, বড়ইতলী, বিবিরখিল ও হারবাং, পেকয়া উপজেলার কয়েকটি এলাকায় এখনো অনেক পরিবার খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে। কোথাও কোথাও সড়ক ভেঙে যাওয়ায় রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শিশু- নারীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ময়মনসিংহ : ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বাড়তে থাকায় ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙন নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের খোদাবক্সপুর ও ভাটিপাড়া গ্রামে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। নদীতে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও স্থানীয় সড়কের অংশ। ঝুঁকির মুখে থাকা প্রায় অর্ধশত পরিবার ইতোমধ্যে তাদের বসতঘর অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছে।
গাইবান্ধা : ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নাদের পানি বেড়েছে। তাবে কমেছে তিস্তা ও করতোয়া নদীর পানি। বৃদ্ধি বা হ্রাস পেলেও এসব নদনদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সন্ধ্যা ৬টার তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ৪১ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৯০ সেমি ও ঘাঘট নদের পানি ২৪ সেমি বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১১৭ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে করতোয়া নদীর পানি ৬ সেমি হ্রাস পেয়ে বিপৎসীমার ৯৩ সেমি ও তিস্তার পানি ২৩ সেমি হ্রাস পেয়ে বিপৎসাীমার ২৪ সেমি নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চলমান এ বন্যার মৌসুমে এখন পর্যন্ত গাইবান্ধায় কোনো নদনদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি। এদিকে মাসখানেক ধরে জেলার সবগুলো নদনদীর পানি কখনো বাড়ছে, আবার কখনো কমছে। আর এই পানি ওঠানামার সঙ্গে নদীর তীরবর্তী ২৫টি পয়েন্টে তীব্র ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
লালমনিরহাট : ভারী বর্ষণ আর উজানের ঢলে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করলেও ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তা আবার নিচে নেমে এসেছে। ফলে লালমনিরহাটের নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিরও দ্রুত উন্নতি ঘটেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে সোমবার সন্ধ্যা থেকে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে লালমনিরহাটের পাঁচটি উপজেলার নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়।