দেশজুড়ে চলমান গ্যাসসংকট পরিস্থিতি ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেই গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে।
আশার খবর হচ্ছে, গ্যাসসংকটের মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাস ক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ (তিতাস-২৮) থেকে এবার জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে সাড়ে ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। এতে পরিস্থিতির আরও কিছুটা উন্নতি হবে বলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আশা করছেন।
জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সরবরাহ বৃদ্ধির পর গ্যাস প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে শিল্পের গ্রাহকদের। আবার লোডশেডিং কমাতে শিল্পের পর বিদ্যুৎ খাতেও গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির পর রাজধানীর বেশ কিছু আবাসিক এলাকায় আগের তুলনায় গ্যাসের চাপ সামান্য বেড়েছে। এ ছাড়া স্বস্তি ফিরেছে সিএনজি গ্যাস স্টেশনগুলোতেও। কিছুদিন আগেও গ্যাসসংকটে যে স্টেশনগুলো বন্ধ ছিল, গতকাল সেগুলোতে যানবাহনে গ্যাস দিতে দেখা গেছে। গাড়িচালকরা জানান, গত দুই দিনে গ্যাসের চাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি গ্যাস নিতে স্টেশনে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার ভোগান্তিও অনেকটা কমেছে। এ ছাড়া ময়মনসিংহের ভালুকা শিল্প এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ আগের চেয়ে ভালো। নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ এলাকায় সরবরাহ বেড়েছে। নরসিংদীর কিছু এলাকায় পরিস্থিতি ভালো বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। এদিকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল তিতাস-২৮ গ্যাসকূপ উদ্বোধন করেছেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ২৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। জ্বালানিসংকটের কারণে আমরা বেশ কিছুদিন ধরে কষ্টের মধ্যে আছি। সে সঙ্গে স্বস্তির খবর নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল)। তিতাস ২৮ নম্বর কূপ থেকে ১২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ ২০৩০ সাল নাগাদ চাহিদা এবং সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য দূর করতে সহায়তা করবে।’ তিনি বলেন, এই কূপের গ্যাস মানুষের মাঝে স্বস্তি আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে পার্থক্য শূন্যে নামিয়ে আনা হবে। এতে শিল্প, বিদ্যুৎ ও গৃহস্থালি খাত বর্তমানে যে সংকটে পড়েছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান হবে।
২৮ নম্বর কূপের প্রকল্প পরিচালক জসিম উদ্দিন মুন্না জানান, কূপটি ওয়েলহেড শাট-ইন প্রেসার ৩৬০০ পিএসআই এবং ফ্লোয়িং প্রেসার ২১০০ পিএসআই। দীর্ঘ সময় কূপটি থেকে গ্যাস উত্তোলন করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. জিয়াউল হক, বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল জলিল প্রামাণিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ, শাহ মো. আবদুর রউফ, জেলা পরিষদের প্রশাসক সিরাজুল ইসলাম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ‘তিতাস ও কামতা ফিল্ডে ৪টি মূল্যায়ন-কাম-উন্নয়ন কূপ খনন’ প্রকল্পের আওতায় চীনের সমন্বিত খনন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি চুয়ানচিং ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে ১০ এপ্রিল ২০২৫ চুক্তি হয়। চুক্তির আওতায় তিতাস-২৮ নম্বর কূপের খননকাজ ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ শুরু হয়ে ১৯ জুন ২০২৬ সফলভাবে শেষ হয়।
প্রসঙ্গত ব্রাহ্মণবাড়িয়া তিতাসের ২৩টি কূপ থেকে প্রতিদিন ৩২৫ থেকে ৩৩০ মিলিয়ন ঘটফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হচ্ছে। এর সঙ্গে ২৮ নম্বর কূপ থেকে নতুন করে প্রায় সাড়ে ১২ মিলিয়ন গ্যাস যুক্ত হয়েছে। এতে করে চলমান গ্যাসসংকট কমে আসতে পারে। এ ছাড়া আরও চারটি কূপের পরীক্ষামূলক কাজ চলমান।
এর আগে পরীক্ষামূলক সরবরাহের সময় তিতাস-২৮ কূপ থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুুক্ত করা হয়। কূপটির গভীরতা ৩ হাজার ৬০১ মিটার বা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। মূসক, আয়করসহ এই কূপ খননে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।