রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেনকে গত মাসের প্রথম দিকে পরপর দুবার ফোন করা হয়। প্রথমবার ফোনকারী নিজেকে সর্বহারা দলের সদস্য দাবি করে বলেন, তাদের দলের কয়েকজনকে জেল থেকে মুক্তি করতে টাকা লাগবে। তাই এতে (শাহরিয়ার) টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে হবে। দ্বিতীয় দফায় আবার ফোন করা হয়। তখন ফোনকারী নিজেকে ‘সিরাজ শিকদারের ছোট ভাই’ হিসেবে পরিচয় দেন এবং কারাগারে থাকা কর্মীদের জামিনের খরচের জন্য টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন।


পরে অধ্যাপক শাহরিয়ার বিষয়টি পুলিশকে জানান এবং ৬ সেপ্টেম্বর মতিহার থানায় জিডি করেন। কলটি মাদারীপুর থেকে করা হয়েছে বলে পুলিশ তাকে জানায়। ব্যবহৃত সিমটি মুফতি রেজাউল করিম নামে একজনের পরিচয়ে নিবন্ধিত বলে জানানো হয়।


শুধু অধ্যাপক শাহরিয়ার হোসেন নন, একই ধরনের ফোন পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষক। তাদের মধ্যে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, গণিত বিভাগের অধ্যাপক গৌর চন্দ্র পাল, সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস এবং কৌশিক সরকার।


ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তাকেও ফোন করে ‘সর্বহারা’ পরিচয় দেওয়া হয়েছিল। তিনি বিষয়টি নিয়ে বেশি কথা না বাড়িয়ে ফোন কেটে দেন। পরে অন্য শিক্ষকদের কাছেও একই ধরনের ফোন যাওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন। সমাজকর্ম বিভাগের অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌসের কাছেও ফোন করে ব্যক্তিগত তথ্য উল্লেখ করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফোনকারী অশালীন ভাষা ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।


শুধু শিক্ষক নন, রাজশাহীর কয়েকজন চিকিৎসকের কাছেও এমন কল করা হয়েছে। তারা বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছেন।


এদিকে একাধিক শিক্ষক ও চিকিৎসককে একই কায়দায় ফোন করার ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে-এর পেছনে কি সংঘবদ্ধ কোনো চক্র আছে? শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর ও পরিচয় কীভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ বলছে, সাধারণ চাঁদাবাজির ফোনের সঙ্গে এ ঘটনাগুলোর কিছু পার্থক্য আছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের মুখপাত্র গাজীউর রহমান বলেন, ফোনকারীরা নিজেদের একটি বিশেষ রাজনৈতিক-সশস্ত্র পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করছে এবং শিক্ষকদের ভয় দেখাতে পরিচিত একটি নাম ব্যবহার করছে। ফলে প্রকৃত পরিচয় আড়াল করে ‘সর্বহারা’ পরিচয়ে কোনো চক্র চাঁদাবাজি করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যে নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছে, তার ডিটেইল আমরা নিয়েছি। সে একজন প্রতারক। এই চক্রটি ঢাকা, ফরিদপুর, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে ফোনের মাধ্যমে প্রতারণা করে।’


নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও নামি চিকিৎসকদের এভাবে ফোন করে ভয় দেখানোর ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, ব্যক্তিগত নম্বরে হুমকি দিয়ে অর্থ দাবি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক এটিএম কামরুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ঘটনার বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে হুমকির শিকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া। তিনি বলেন, শিক্ষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত হুমকিদাতাদের শনাক্ত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।