প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সরাসরি বরাদ্দ এবং স্টার্টআপ তহবিল মিলিয়ে দেশের ৫ কোটি তরুণ বা যুবকের ভাগে মাথাপিছু বরাদ্দ পড়ে প্রায় ৬৫৭ টাকা। তবে শিক্ষা, কারিগরি ও আইটি খাতের মতো যুব-সম্পৃক্ত পরোক্ষ খাতগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এই মাথাপিছু বরাদ্দের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ২৮ হাজার টাকা। জুলাই অভ্যুত্থানে দেশের তরুণ সমাজের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশি। ফলে সেই আন্দোলনের পর পরিবর্তিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বাজেটে তরুণ ও যুবসমাজের জন্য কী বরাদ্দ থাকছে, তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।  


অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট উপস্থাপন করেছেন। প্রস্তাবিত বাজেটে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা এবং স্টার্টআপ ও ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ৭০০ কোটি টাকা মিলিয়ে মোট ৩ হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। দেশের ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি যুব জনসংখ্যাকে প্রায় ৫ কোটি ধরে মাথাপিছু বরাদ্দের মাথাপিছু সরাসরি বরাদ্দ আসে প্রায় ৬৫৭ টাকা। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী দেশে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সিদের যুব ধরা হয়। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সাধারণত ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের যুব হিসেবে বিবেচনা করে। বিবিএসের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সি জনসংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৬০ লাখ। সে হিসেবে ১৫ থেকে ৩৫ বছর বয়সি জনসংখ্যার পরিমাণ আনুমানিক ৫ কোটি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ দিয়ে যুবসমাজের বাজেটের হিসাব করা যাবে না। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাতে তরুণদের জন্য পরোক্ষ বরাদ্দ রয়েছে। শিক্ষা খাতের মোট বরাদ্দের একটি বড় অংশ (উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি) এবং যুববান্ধব অন্যান্য খাতের উপবরাদ্দ মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা তরুণদের পেছনে পরোক্ষভাবে ব্যয় হবে। এই বিশাল অঙ্ককে ৫ কোটি তরুণ দিয়ে ভাগ করলে জনপ্রতি বাজেট দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা।


অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেটে তরুণদের ভাগ কত ছিল : জুলাই অভ্যুত্থানের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান করে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের যে বাজেট উপস্থাপন করে সেখানে শিক্ষা, কারিগরি এবং তথ্যপ্রযুক্তির মতো যুববান্ধব পরোক্ষ উপখাতগুলো মিলিয়ে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকা। ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের উত্থাপিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সরাসরি যুব ও ক্রীড়া খাতের মূল বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা। তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে ‘তারুণ্যের উৎসব’ এবং নতুন স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ তহবিল মিলিয়ে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। তরুণদের উন্নয়নসংশ্লিষ্ট প্রায় ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকাকে ৫ কোটি যুব জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে জনপ্রতি পরোক্ষ বরাদ্দ আসে প্রায় ২২ হাজার ৮০০ টাকা। শুধু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের ২ হাজার ৪২৩ কোটি টাকার মূল বাজেট থেকে হিসাব করলে জনপ্রতি সরাসরি প্রশিক্ষণ ও ক্রীড়া উন্নয়ন বরাদ্দ পড়েছিল প্রায় ৪৮৪ টাকা। সে হিসেবে বিএনপি সরকারের প্রস্তাবিত বাজেটের সামগ্রিক বরাদ্দ ধরে হিসাব করলে অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় তরুণদের জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ বেড়েছে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা।


যেভাবে ব্যয় হবে তরুণদের বাজেট : পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা ও যুব উন্নয়ন মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এই বিশাল অর্থ মূলত তিনটি পৃথক বিভাগ এবং তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী বিভিন্ন প্রযুক্তিগত প্রকল্পের মাধ্যমে খরচ করা হবে। ১. মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ : তরুণদের উচ্চশিক্ষা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন এবং বৃত্তির জন্য এই খাতে সর্বোচ্চ ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত শিক্ষাঋণ প্রকল্প চালু হবে; দেশের তরুণী বা ছাত্রীদের জন্য স্নাতক পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ করা হবে; বৈশ্বিক বাজারে তরুণদের কর্মসংস্থান বাড়াতে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি একটি তৃতীয় ভাষা (যেমন জাপানি, কোরিয়ান, ম্যান্ডারিন, ফ্রেঞ্চ বা আরবি) শেখানো বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।


২. কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ : তরুণদের সরাসরি কর্মসংস্থানমুখী এবং কারিগরিভাবে দক্ষ করে গড়ে তুলতে এ বিভাগে ১৮ হাজার ৪৫৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দ থেকে নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে সব শিক্ষার্থীর জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার রূপরেখা বাস্তবায়ন করা হবে; বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের যৌথ উদ্যোগে তরুণদের জন্য স্বল্পমেয়াদি শর্ট কোর্স, শিক্ষানবিশ ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ তৈরি করা হবে। এ ছাড়া ভবিষ্যৎ তরুণ সমাজ অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা খাতে ৪৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব বরাদ্দ ছাড়াও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বা আইসিটি খাতের বরাদ্দ থেকে সরাসরি তরুণ ও স্টার্টআপদের জন্য বিশেষ কিছু অনুদান রাখা হয়েছে। নতুন তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক আইডিয়া সহায়তায় ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, অ্যানিমেশন ও গেমিং খাতের বিকাশে সরকারের সরাসরি অনুদান দেওয়া হয়েছে ৩০০ কোটি টাকা। এই খাতের ফ্রিল্যান্সারদের অর্জিত আয়কে সম্পূর্ণ আয়কর ও ভ্যাটমুক্ত রাখা হচ্ছে। প্রযুক্তিভিত্তিক নতুন উদ্ভাবনী স্টার্টআপগুলোর জন্য ৯ বছরের কর অবকাশ এবং টার্নওভার ট্যাক্স সম্পূর্ণ শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ডিজিটাল ডিভাইড বা বৈষম্য কমাতে ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ উদ্যোগ, ইউনিক এডু-আইডি প্রদান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই সম্প্রসারণে এই অর্থ ব্যয় হবে।


প্রযুক্তিতে ২ লাখ নতুন চাকরি : চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও অটোমেশনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর সরাসরি ২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ফ্রিল্যান্সিং এবং ক্রিয়েটিভ সেক্টরে ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও ৮ লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করার উদ্যোগ রয়েছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনে তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ফোন সার্ভিসিং, কেয়ারগিভিং এবং বিভিন্ন বৈদেশিক ভাষার ওপর বিশেষ কর্মমুখী প্রশিক্ষণ প্রকল্প চালু করা হচ্ছে।


ক্রীড়াবিদ ও তরুণ প্রতিভার জন্য সুযোগ : খেলাধুলাকে স্রেফ বিনোদন নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটে খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর অধীনে ৩০০ জন অ্যাথলেটকে নিয়মিত স্পোর্টস অ্যালাউন্স বা ক্রীড়া ভাতা দেওয়া হবে। ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সি প্রতিভাবান তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস প্রোগ্রাম’ চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্কলারশিপ দেওয়া হবে। প্রতিভাবান তরুণ ক্রীড়াবিদদের দীর্ঘমেয়াদি স্কলারশিপ বা বৃত্তির জন্য আলাদাভাবে ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের ৬৪টি জেলায় আধুনিক ‘স্পোর্টস ভিলেজ’ নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে, যার প্রাথমিক নকশা ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় প্রস্তুত করা হয়েছে।