হাম-ডেঙ্গুর জোড়া আঘাতে সংকটে স্বাস্থ্য খাত
রাজধানীর উত্তরা থেকে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মহাখালী ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালে এসেছিলেন তৌহিদুল হক (২৮)। সঙ্গে স্ত্রী রুখসানা খাতুন এবং কোলে এক বছরের ছেলে। রুখসানা জানান, গত বছর আমার ভাই ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে এই হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। কিন্তু এবার হাসপাতালে এলে জানতে পারি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নিচ্ছে না। শুধু হামের রোগী ভর্তি হচ্ছে এ হাসপাতালে।
করোনা মহামারির সময় চালু হওয়া মহাখালী ডিএনসিসি কভিড-১৯ হাসপাতালে রয়েছে প্রায় এক হাজার শয্যা। করোনা নিয়ন্ত্রণে আসার পর এ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা চলত। ফলে অন্য হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ কম হতো। কিন্তু এ বছর এই হাসপাতালে চিকিৎসা চলছে হাম আক্রান্ত রোগীদের। হাম সংক্রামক ব্যাধি হওয়ায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দিতে পারছে না হাসপাতালটি। ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলা ডেঙ্গু রোগীদের চাপ বাড়ছে রাজধানীর অন্য হাসপাতালগুলোতে। ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়ে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন অন্য রোগে আক্রান্ত রোগীরা। আর এতে করে হাম ও ডেঙ্গুর জোড়া আঘাতে সংকটে পড়েছে স্বাস্থ্য খাত। সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৯৯০ জন মানুষের বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি হাসপাতালের শয্যা। আর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ হাজার ৯০৮ জন। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৬ শতাংশ। এতে করে কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছে না অন্য রোগের রোগীরা, দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. মো. নুরুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভরা মৌসুমে প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। হাম আক্রান্তও থামেনি। রাজধানীর কিছু হাসপাতালে চাপ বেশি, কোথাও কম। তবে এখনো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে শয্যা বাড়ানোর ব্যবস্থা নিতে হবে।’ সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্যালাইন, কিট, ওষুধের সংকট নেই। হাসপাতালে রোগীর তুলনায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মীদের সংকট তো আগে থেকেই রয়েছে। সংকট নিরসনে চিকিৎসক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। সাত হাজার নার্স নিয়োগের পরীক্ষা চলমান। নিয়োগগুলো সম্পন্ন হলে সেবার মান আরও বাড়বে।’
হিমশিম পরিস্থতি হাসপাতালে : হাম ও ডেঙ্গু রোগীর এই চাপ সামলাতে হাসপাতালগুলোতে হিমশিম পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় অনেক হাসপাতালে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। কোথাও মেঝেতে রেখে চলছে চিকিৎসা। আবার কোথাও শয্যা না পেয়ে রোগী নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে স্বজনদের। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও বাড়ছে রোগীর চাপ।
সংক্রামক রোগের রোগীদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগের চিকিৎসাও চালিয়ে যেতে হচ্ছে হাসপাতালগুলোকে। কিন্তু একই সময়ে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় শয্যা, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং জনবলের ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের সংকট থাকায় রোগীদের নিয়মিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে হাম-ডেঙ্গুর রোগীদের পাশাপাশি অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও কাক্সিক্ষত সময়ে সেবা না পাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।
২০২২ সালের স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে মোট শয্যা রয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার ৬৭৫টি। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে ৭১ হাজার ৬৬০টি এবং বেসরকারি হাসপাতালে ৯৯ হাজার ৯৭৫টি শয্যা রয়েছে। স্বাস্থ্য বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি ৯৯০ জন মানুষের বিপরীতে রয়েছে মাত্র একটি হাসপাতালের শয্যা। অর্থাৎ প্রতি ৫০ জন মানুষের বিপরীতে হাসপাতালের শয্যার সংখ্যা মাত্র ০.০২১১টি। অথচ গত ২৪ ঘণ্টাতেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৮৯ জন। হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর এই চাপে সংকটে পড়ছে স্বাস্থ্য খাত।
সাড়ে ছয় মাসেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি হাম : গত ১৫ মার্চ থেকে সাড়ে ছয় মাসে হাম ও হামের উপসর্গে মারা গেছেন ১ হাজার ১২৫ জন। এর অধিকাংশই শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকাল তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (গত শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল সকাল ৮টা) হামের উপসর্গে মারা গেছেন তিনজন। এ সময় সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২১৮ জন। এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৪১৮ জন। একই সময়ে নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ২১ হাজার ৭৪৮ জন। হাম নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্বিতীয় দফা টিকা ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এ পর্যন্ত ২ কোটি ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০৫ শিশুকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সাব্বির হায়দার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হাম নিয়ন্ত্রণে টিকাদান চলমান রয়েছে। নির্দিষ্ট বয়সের কোনো শিশু যেন বাদ না পড়ে সেজন্য আমরা কাজ করছি। টিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক সময় গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সবার সচেতনতা পারে এসব গুজবকে রুখে দিতে।’
ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী : রাজধানীসহ সারা দেশে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। ফলে হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে নতুন করে ২ হাজার ৮৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ছয়জন। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৬ হাজার ৪৫৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ২৬২ জনের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, এ বছরের সেপ্টেম্বরে ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ মাসে মৃত্যু হয়েছে ১৪৮ জনের। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫ হাজার ৮৬৬ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৭৬ জন।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক বছরের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে ২৭ হাজার ৯০৮ জন। বৃদ্ধির হার প্রায় ১৭৬ শতাংশ। একই সময়ে মৃত্যু বেড়েছে ৭২ জন, যা প্রায় ৯৫ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ গত বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় এ বছরের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত প্রায় ২ দশমিক ৮ গুণ এবং মৃত্যু প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৮ হাজার ৯৭ জন, মারা গিয়েছিলেন ৮০ জন।
চলতি বছরের মাসভিত্তিক হিসাবেও সেপ্টেম্বরের তীব্রতা স্পষ্ট। জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৮৪৬ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সেপ্টেম্বরে এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। ফলে বছরের মোট আক্রান্ত ৮৬ হাজার ৪৫৮ জনে দাঁড়িয়েছে। সেপ্টেম্বরের ১৪৮ মৃত্যু নিয়ে এ বছর মোট মৃত্যুও ২৬২ জনে পৌঁছেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ বলেন, অন্তত তিন থেকে চার দশক ডেঙ্গু বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে টিকে থাকতে পারে। ডেঙ্গুকে সাময়িক কিংবা মৌসুমি রোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এটি এখন বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বাস্থ্যঝুঁঁকি।’