বিদেশের যেকোনো গেমস হলেই একটা প্রশ্ন বারবার মনে জাগে-এত বড় দল পাঠানোর দরকার কী? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৮ সালে থাইল্যান্ডে অষ্টম এশিয়ান গেমসে অংশ নেন দেশের ক্রীড়াবিদরা। এটাই ছিল আন্তর্জাতিক কোনো গেমসে প্রথম অংশগ্রহণ। সেই থেকে প্রশ্ন উঠছে-যেখানে সাফল্য নেই সেখানে অঢেল অর্থ খরচ করে বিশাল বহর যাবে কেন? যেহেতু গেমস সেখানে খেলোয়াড়রা যাবেনই, এ নিয়ে তাই প্রশ্ন নেই। কর্মকর্তারা ঢালাওভাবে যেভাবে দলের সফরসঙ্গী হন তা নিয়েই যত বিতর্ক। শুধু কি ফেডারেশন? ক্রীড়া পরিষদ, ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতারাও সরকারি খরচে গেমসে পর্যবেক্ষক হিসেবে যাচ্ছেন। এ তালিকায় আবার কর্মকর্তাদের স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরাও থাকছেন।


এশিয়ান, কমনওয়েলথ, অলিম্পিক, এসএ, ইসলামি সলিডারিটি গেমস-সব খেলাধুলাতেই বিশাল বহর। ১৯৭৮ সাল অর্থাৎ ৪৮ বছর আগে এশিয়ান গেমস দিয়ে এ বদভ্যাসের যাত্রা। সেখানে হাজারো সমালোচনার পরও দৃশ্যপটটা কোনোভাবেই বদলানো যাচ্ছে না। যখন যে সরকার দায়িত্বে আসছে তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছে ক্রীড়াঙ্গনের অর্থ অপচয় বন্ধ করার কথা। যেসব খেলার পদক জেতার সম্ভাবনা রয়েছে সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা। অযথা ডিসিপ্লিন বাড়ানো, কর্মকর্তাদের সফরসঙ্গী করাটা বাদ দিতে হবে। তা না হলে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। তার পরও মানা হচ্ছে না এ সরকারি নির্দেশ। বরং বহর বাড়ানোর প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে।


বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত অলিম্পিক গেমসে কোনো পদকই জিততে পারেনি। কমনওয়েলথ গেমসে দুই সোনা, রুপা ও তামা এসেছে। তাও শুধু শুটিংয়ে সীমাবদ্ধ। এশিয়ান গেমসের ইতিহাসে একবারই সোনা জয়। তাও পুরুষ ক্রিকেটারদের বদৌলতে। ২০১০ সালে এ সাফল্য আসে। নারী ক্রিকেটে দুবার রুপা, একবার তামা ও অন্যান্য খেলায় পদক এসেছে। ৪৮ বছওে মোট ১৪টি পদক এসেছে এশিয়ান গেমস থেকে। অথচ ছোট দেশে বিশাল বহর পাঠানোর দিক দিয়ে বাংলাদেশই চ্যাম্পিয়ন। সাফল্যের দিক দিয়ে সাউথ এশিয়ান অর্থাৎ এসএ গেমসে বাংলাদেশ এগিয়ে। এসএ গেমসে বিদেশে দল পাঠানো নিয়ে তেমন বিতর্ক না উঠলেও এশিয়ান, কমনওয়েলথ ও অলিম্পিক গেমস নিয়ে যত বিতর্ক। চলতি বছরের ১৯ সেপ্টেম্বর জাপানে আইচি-নাগোয়ায় শুরু হবে ২০তম এশিয়ান গেমস। এবার বাংলাদেশ ২২ খেলায় অংশ নেবে। মোট বহর ২৭৪ জনের। এর মধ্যে খেলোয়াড় ১৮৭, কোচ ৩৭, কর্মকর্তা ৪৩, চিকিৎসক ৫ ও প্রেস অ্যাটাশে ২ জন। এর মধ্যে দলীয় ও একক খেলা রয়েছে। খেলোয়াড়ের সংখ্যা বেশি হবেই। কিন্তু ৪৩ জন কর্মকর্তার সেখানে কাজ কী? কোচের চেয়ে অফিশিয়ালের সংখ্যা বেশি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কোনো কোনো কর্মকর্তা নাকি কোচ সেজে জাপানে যাচ্ছেন। যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকও এতে বিরক্ত। তিনি বলেছেন, ‘এখন থেকে আমরা বহর কমানোর কাজটি করব। সম্ভাব্য সাফল্য ছাড়া ডিসিপ্লিন বাড়ানো যাবে না।’


আমিনুলের মতো অতীতেও ক্রীড়ামন্ত্রীরা একই কথা বলেছেন। কিন্তু কাজ হয়নি। বহর যেমন বাড়ছে তেমন ডিসিপ্লিনও। অধিকাংশ খেলাতেই বাংলাদেশি প্রতিযোগীরা হিটেই টেকেন না। ৪০ থেকে ৬০তম স্থান দখল করেন। কর্মকর্তাদের খেলার সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। কেনাকাটাতেই ব্যস্ত থাকেন। এভাবে দল বাড়িয়ে লাভ কী? সরকার চাচ্ছে অপচয় রোধ করতে। ফেডারেশন ও অলিম্পিক সংস্থা তা কোনোভাবেই মানছে না। মনে হচ্ছে সরকারের ভিতর তারাই আরেক সরকার।