লিওনেল মেসি—ফুটবলের জাদুকর হুডিনি, কবিতার মহাকবি মিল্টন, ক্যানভাসের লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি, যুদ্ধের ময়দানে গ্রিক বীর অ্যাকিলিস। যেন একের ভিতর দশ! সবুজ মাঠে হুডিনির জাদুর মুগ্ধতায় জাদুকরী ফুটবল খেলে মেসি বিমোহিত করেছেন পুরো ফুটবলবিশ্বকে। মাঠের সবুজ ঘাসের ক্যানভাসে ভিঞ্চির অমর শিল্প ‘মোনালিসা’র মতো সৌন্দর্য উপহার দিয়েছেন তিনি। আর ফুটবলের লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করেছেন গ্রিক যোদ্ধা অ্যাকিলিসের পারদর্শিতায়।


শিল্পী, কবি, জাদুকর ও যোদ্ধার অনন্য মিশেলে বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি এবার আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলেছেন। আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা জার্সি গায়ে আফ্রিকান প্রতিনিধি বেনিনের বিপক্ষে খেলেছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। বিদায় বলেছেন প্রিয় জাতীয় দলকে। বিদায় বলার মুহূর্তে কেঁদেছেন ৪৭টি ট্রফি জয়ী ও আটবারের বিশ্বসেরা ফুটবলার মেসি। তাঁর বিদায়ে কেঁদেছে গোটা ফুটবলবিশ্ব।


লিওনেল মেসির বিদায়কে স্মরণীয় করে রাখতে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনেও ছিল না কোনো কমতি। সাড়ম্বর আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিশ্বসেরা ফুটবলারকে বিদায় জানানো হয়। ঐতিহাসিক সেই বিদায়ী ম্যাচের সাক্ষী হতে বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন ৮৫ হাজারের বেশি দর্শক। শুধু গ্যালারিতেই নয়, প্রিয় ফুটবলারের শেষ ম্যাচের সাক্ষী হতে স্টেডিয়ামের বাইরেও ছিল মানুষের উপচে পড়া ভিড়।


মেসির বিদায়ী ম্যাচে মাঠে উপস্থিত ছিলেন তাঁর একসময়ের সতীর্থ অ্যাঞ্জেল দি মারিয়া ও নিকোলাস ওতামেন্দিসহ ব্রাজিলের নেইমার এবং ফ্রান্সের সাবেক ফুটবলার ডেভিড ত্রেজেগে। বিশ্বসেরা ফুটবলারের বিদায়ে সবার চোখেই ছিল জল। আবেগঘন সেই মুহূর্তে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষাই যেন জানা ছিল না কারও।


ম্যাচের আগেই শুরু হয় মেসিকে সম্মান জানানোর আনুষ্ঠানিকতা। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে টাঙানো হয় ১০ নম্বর লেখা আর্জেন্টিনার বিশাল একটি জার্সি। সেখানে স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল—‘ধন্যবাদ’। স্টেডিয়ামের প্রতিটি দর্শকের গায়ে ছিল আর্জেন্টিনার জার্সি, আর সেই জার্সিতে ছিল প্রিয় মেসির নাম ও ১০ নম্বর।


সম্মাননা পর্বের মধ্যেই মাঠে প্রবেশ করেন মেসি। দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়ক মাঠে প্রবেশ করতেই স্টেডিয়ামের আকাশজুড়ে শুরু হয় আতশবাজির রোশনাই। ভিআইপি বক্সে উপস্থিত ছিলেন মেসির মা সেলিয়া, স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জো এবং তিন ছেলে থিয়াগো, মাতেয়ো ও সিরো। সন্তান, প্রিয়জন ও বাবার বিদায়ের মুহূর্তে সবার চোখেই ছিল জল।


মেসির সতীর্থদের চোখেও ছিল অশ্রু। আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও। মেসির চোখ দিয়েও গড়িয়ে পড়ছিল পানি। এক আবেগঘন মুহূর্তে যেন পুরো স্টেডিয়ামই পরিণত হয়েছিল কান্নার সাগরে। বেনিনের ফুটবলাররা হয়তো কাঁদেননি, কিন্তু বিশ্বসেরা ফুটবলারের বিদায়ী ম্যাচের সাক্ষী হয়ে তাঁরাও ছিলেন সমব্যথী।


ম্যাচ শুরুর আগে টসের আনুষ্ঠানিকতার পূর্বে বেনিনের অধিনায়ক মেসির হাতে তুলে দেন একটি বিশেষ স্মারক উপহার। অ্যামাজন জঙ্গলের আদলে তৈরি একটি ভাস্কর্যের সঙ্গে ছিল একটি চিঠিও। ম্যাচ শেষে চিলির রেফারিও মেসিকে স্মৃতি হিসেবে রেখে দেওয়ার জন্য উপহার দেন একটি লাল ও একটি হলুদ কার্ড।


মেসির বিদায়ী ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের তিনটি গোলেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিলেন মেসি। নিজে একটি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও দুটি গোল। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের শেষ ম্যাচটিকেও নিজের স্বভাবসুলভ নৈপুণ্যে স্মরণীয় করে রেখেছেন এই কিংবদন্তি।


মেসির বিদায়ে ফুটবলবিশ্ব হারাল এক অমর শিল্পীকে। এমন একজন শিল্পী, যিনি ফুটবলকে শুধু একটি খেলা হিসেবে দেখেননি; বরং সবুজ মাঠকে পরিণত করেছেন শিল্পের ক্যানভাসে। তাঁর জাদুকরী ড্রিবল, নিখুঁত পাস, অসাধারণ গোল এবং ফুটবলীয় সৌন্দর্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুগ্ধ করবে।


মেসির অভাব কখনো পূরণ হবে কি না, তার উত্তর দেবে সময়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—মেসি আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও তাঁর কীর্তি কখনো বিদায় নেবে না। তাঁর অর্জন, তাঁর রেকর্ড, তাঁর সৌন্দর্যময় ফুটবল এবং অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত তাঁকে চিরকাল অমর করে রাখবে ফুটবল ইতিহাসে।