রাসায়নিক সারের ৭০ শতাংশের বেশি ব্যবহৃত হয় বোরো মৌসুমে। গ্যাস সংকটের কারণে খাদ্য উৎপাদনের সবচেয়ে বড় মৌসুম সেই বোরো আবাদের আগে দেশীয় কারখানাগুলোর ইউরিয়া সার উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশের ইউরিয়া সার উৎপাদন ও সরবরাহকারী সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) জানিয়েছে, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন নিশ্চিত করার জন্য তারা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না।
আশুগঞ্জ সার কারখানাসহ পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা রয়েছে বিসিআইসির আওতাধীন। এর মধ্যে গ্যাসের চাপ না থাকায় বন্ধ রয়েছে আশুগঞ্জ সার কারখানা। এ ছাড়া গ্যাস সংকটের কারণে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি এবং চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড-এ চারটি কারখানার উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি অর্থ, জ্বালানি, শিল্প ও কৃষি মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বিসিআইসি। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ঘোড়াশাল, পলাশ, শাহজালাল এবং চিটাগাং- এ চার ইউরিয়া সার কারখানার মাধ্যমে বছরে কমপক্ষে ১৮ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদন করতে ১৯৭ মিলিয়ন স্ট্যান্ডার্ড ঘনফুট (এমএমসিএফ) গ্যাসের প্রয়োজন হবে। অথচ পেট্রোবাংলা গ্যাসের ইউনিট প্রতি ১৩ টাকার বেশি দাম বাড়িয়েও দৈনিক গড়ে ১৪০ ঘনফুট গ্যাস দিতে চাইছে। চিঠিতে বিসিআইসি বলেছে, পেট্রোবাংলার প্রস্তাবিত গ্যাস দিয়ে ঘোড়াশালসহ সর্বোচ্চ দুটি কারখানা চালু রাখা যাবে। চিঠির বিষয়টি নিশ্চিত করে বিসিআইসির চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গ্যাসের সংকট হলেও আগামী বোরো মৌসুমে সারের সংকট হবে না। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কম হলেও আমদানির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণ করা হবে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া ইউনিট প্রতি গ্যাসের দাম বাড়লেও অর্থ বিভাগ ট্রেড গ্যাপ বাবদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়ায় ইউরিয়া সার বাবদ কৃষকদের অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে না বলেও জানান তিনি।
সূত্র জানায়, প্রতি বছর বাংলাদেশে ইউরিয়া সারের চাহিদা ৩০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি, যা দেশের ধান ও অন্যান্য ফসলের জন্য দরকার। এর মধ্যে বোরো আবাদের জন্য প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার দরকার। বিসিআইসির অধীন কারখানার মাধ্যমে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদন ও সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে; বাকিটা সৌদি আরব, কানাডা ও মরক্কোর মতো দেশ থেকে নিয়মিত আমদানি করা হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না করায় অভ্যন্তরীণ ইউরিয়া উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারে না বিসিআইসি। সংস্থাটি বলছে, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় দেশের কারখানাগুলোতে গড়ে ৮ থেকে ১১ লাখ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হচ্ছে। ফলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে বিদেশ থেকে আমদানির সার দিয়ে দেশের চাহিদা মেটানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির মাধ্যমে দেশের সার কারখানাগুলো চালু রাখার সুপারিশ ছিল। এলএনজি আমদানি বাবদ যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে তা সমন্বয় করার জন্য সার কারখানায় প্রতি ঘনফুট গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ৩০ টাকা করার প্রস্তাব ছিল। এ ছাড়া বছরে ১৮ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যে সার্বক্ষণিক (১১ মাস বা ৩৩০ দিন) চারটি কারখানা চালু রাখতে গড়ে দৈনিক ১৮০ দশমিক ৮১ এমএমসিএফ গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল ওই কমিটি।
সূত্রগুলো জানায়, ওই সুপারিশের পর গত ২৩ নভেম্বর সার কারখানার জন্য প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৯ দশমিক ২৫ টাকা করা হয়। এতে সার কারখানার প্রতি ইউনিট গ্যাসের জন্য দাম বাড়ে ১৩ টাকার বেশি। কিন্তু দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের পরও পেট্রোবাংলার সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়েছে, বিসিআইসির চারটি কারখানার অনুমোদিত লোডের ন্যূনতম ৭০ শতাংশ হিসেবে দৈনিক গড়ে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করবে। বিসিআইসির কর্মকর্তারা বলছেন, পেট্রোবাংলার প্রস্তাবিত গ্যাস দিয়ে ঘোড়াশাল সার কারখানাসহ সর্বোচ্চ দুটি সার কারখানা চালু রাখা যেতে পারে। এতে অভ্যন্তরীণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সার উৎপাদন করা সম্ভব হবে না।