ইসলামের ইতিহাসে সাহাবায়ে কেরামের নাম তারকার মতো জ্বলজ্বলে। তাঁরা ইসলামের প্রথম প্রজন্ম এবং আল্লাহর রসুল (সা.)-এর একান্ত সঙ্গী ছিলেন। নবীজি (সা.)-এর জীবন, আদর্শ ও সংগ্রাম তাঁরা সবচেয়ে কাছ থেকে দেখেছেন। শুধু দেখেননি, নিজেদের জীবনে ধারণ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছিয়েছেন। সাহাবিদের জীবন তাই কেবল ইতিহাসের কোনো অধ্যায় নয়, বরং ইমানের এক জীবন্ত পাঠশালা। তাঁদের জীবন আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি গভীর ভালোবাসা, অবিচল বিশ্বাস, সীমাহীন ত্যাগ ও আনুগত্যের অনুপম দৃষ্টান্ত। তাঁদের জীবনের প্রতিটি পাঠ আমাদের হৃদয়ে নতুন করে ইমানের স্পন্দন জাগিয়ে তোলে।


রসুল (সা.)-এর সিরাতের সঙ্গে সাহাবিদের জীবনের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। নবীজি (সা.)-এর আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম এবং দীন প্রতিষ্ঠার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সাহাবিরা ছিলেন তাঁর সবচেয়ে কাছে। তাই নবীজি (সা.)-এর সিরাতকে পূর্ণাঙ্গভাবে উপলব্ধি করতে হলে সাহাবিদের জীবনও জানা জরুরি। তাঁদের জীবন যত গভীরভাবে পাঠ করা যাবে, নবীজি (সা.)-এর সিরাতের শিক্ষা তত বেশি জীবন্ত ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে উঠবে। ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠায় সাহাবিদের ত্যাগের কথা স্মরণ করলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। তাঁরা নিজেদের জীবন, সম্পদ, পরিবার ও স্বদেশ-সবকিছুর চেয়ে দীনকে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তাঁদের এই অনন্য উৎসর্গ ও আত্মত্যাগের কারণেই ইসলামের আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আজ আমাদের কাছে পর্যন্ত পৌঁছেছে। দীনের জন্য তাঁদের একনিষ্ঠতা এতটাই প্রগাঢ় ছিল, স্বয়ং মহান আল্লাহ কোরআনে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন।


কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট (সুরা তাওবা)’। সাহাবিদের জীবন ছিল বিরামহীন ত্যাগের এক সৌরভময় উপাখ্যান। আমরা যখন হিজরতের ইতিহাস পাঠ করি, তখন তাঁদের ইমানি দৃঢ়তা দেখে বিমোহিত হই। নবীজি (সা.)-এর নির্দেশে তাঁরা নিজ মাতৃভূমি, আত্মীয়স্বজন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং আজীবনের সঞ্চয় ত্যাগ করে মদিনার পথে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না, জীবনেরও কোনো নিশ্চয়তা ছিল না-তবু তাঁরা বিচলিত হননি। বর্তমান যুগে একজন শরণার্থী যখন এক দেশ থেকে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়, তখন অন্তত কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে নিতে পারে। কিন্তু সাহাবিরা একদম রিক্ত হস্তে হিজরত করেছিলেন। এই যে ত্যাগের পরাকাষ্ঠা, তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।


সাহাবিদের প্রতি আমাদের মুগ্ধতা আরও বৃদ্ধি পায়, যখন আমরা তাঁদের জিহাদের ময়দানের ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করি। বিশেষ করে তাবুক অভিযানের সেই কঠিন মুহূর্তের কথা স্মরণ করলে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। একদিকে প্রচণ্ড দাবদাহ, অন্যদিকে খাবারের তীব্র সংকট। মদিনার প্রধান সম্পদ খেজুর তখন পরিপক্ব হয়েছে, যা সংগ্রহের তখনই শ্রেষ্ঠ সময়। কিন্তু আল্লাহর রসুল (সা.)-এর ডাক আসামাত্র তাঁরা সেই ফসল আর সুখস্বাচ্ছন্দ্য পেছনে ফেলে মরুভূমির তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিয়েছেন। এই সফরে তৃষ্ণায় যখন তাঁদের অবস্থা মরণাপন্ন, পানি নেই, তখন জীবন বাঁচাতে তাঁরা নিজেদের বাহন উট জবাই করে উটের পেটের ভিতর সংরক্ষিত পানি পান করেছেন। এই যে আত্মত্যাগ, তা কেবল আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সা.)-এর প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা ও গভীর আনুগত্যের ফলেই সম্ভব হয়েছিল।


সাহাবিদের মর্যাদা এত বেশি যে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় সমপরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান করে, তবু তা সাহাবিদের এক মুদ কিংবা তার অর্ধেক দানের সমান হবে না’ (বুখারি)। এর কারণ হলো, সাহাবিদের প্রতিটি কাজ ও প্রতিটি দান ছিল ইসলামের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্তে, আর তা ছিল একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।


সাহাবায়ে কেরামের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর জীবনের একটি ঘটনা স্মরণ করা যায়। নবীজি (সা.) খুতবা চলাকালীন উপস্থিত জনতাকে বললেন, ‘বসো’। তখন ইবনে মাসউদ (রা.) মসজিদের বাইরে রাস্তায় ছিলেন। তিনি নবীজি (সা.)-এর এই নির্দেশ শোনামাত্রই ঠিক সেখানেই বসে পড়লেন। জায়গাটি বসার উপযোগী কি না, তা ভাবার ফুরসতও তাঁর হয়নি। রসুল (সা.)-এর প্রতি এই যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ধ্রুব আনুগত্য, তা আমাদের প্রজন্মের জন্য মহান শিক্ষা। আজকের এই বৈষয়িক উন্নতির যুগে যদি আমরা নবীজি (সা.)-এর সিরাত ও সাহাবিদের জীবন পাঠ করি, তাহলে বুঝতে পারব, মনুষ্যত্বের প্রকৃত মাপকাঠি কী। তাঁরা ছিলেন সেই উজ্জ্বল প্রজন্ম, যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে আমরা আজ ইসলামের সুশীতল ছায়া পেয়েছি। পৃথিবীতে বহু মনীষী এসেছেন, কিন্তু নবীজি (সা.)-এর সাহাবিদের মতো আত্মত্যাগী দল আর কখনো আসেনি। তাই সঠিক পথের দিশা পেতে এবং অন্তরে ইমানের আলো প্রজ্বলিত করতে সাহাবিদের জীবন পাঠ ও তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করার বিকল্প নেই।