যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালালে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিতে দেশটির নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জ্যেষ্ঠ ইরানি আইনপ্রণেতা মোহাম্মদ-সালেহ জোকার। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) অনুযায়ী সহযোগিতা স্থগিত করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।


বৃহস্পতিবার ইরানের পার্লামেন্টের ইন্টারন্যাল অ্যাফেয়ার্স কমিটির চেয়ারম্যান জোকার এ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘দেশের প্রতিরক্ষা ও প্রতিরোধ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে পারমাণবিক অস্ত্রসহ প্রতিরোধমূলক অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দিতে আমি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’


এ ছাড়া কোনো দেশ ইরানে হামলা চালানোর জন্য মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহারের সুযোগ দিলে কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এই আইনপ্রণেতা। তাঁর ভাষায়, এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশকে চড়া মূল্য দিতে হবে।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে তেহরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক হুমকির সর্বশেষ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে জোকারের এই বক্তব্য। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন।


বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ব্যাপকভাবে দুর্বল করে দিয়েছে। প্রয়োজনে দেশটির বিরুদ্ধে আরও হামলা চালানো হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।


ট্রাম্প বলেন, ‘অনেক আগেই অন্য প্রেসিডেন্টদের এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে আমরা তাদের একেবারে গুঁড়িয়ে দিয়েছি, আর প্রয়োজনে আরও কিছুটা এগোতে পারি।’


ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান নিয়ে মার্কিন জনগণের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, কেউ কেউ তাঁর পদক্ষেপ সমর্থন করছেন, আবার কেউ হয়তো করছেন না। তবে ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যাবে না বলে জোর দেন তিনি।


ট্রাম্পের ভাষায়, ‘এর জন্য মূল্য দিতে হবে, যা আমি শুরুতেই জানতাম। কিন্তু ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া যায় না।’


এদিকে, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করেছে মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। তবে এসব পরিকল্পনায় ট্রাম্প চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।


ইরানের কাছে কি পারমাণবিক অস্ত্র আছে?

প্রকাশিত নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ইরানের কাছে বর্তমানে কোনো নিশ্চিত পারমাণবিক বোমা নেই। তবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে।


ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন করেছে। এই মাত্রা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সমৃদ্ধকরণের স্তরের কাছাকাছি হলেও, শুধু ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকলেই তা পারমাণবিক বোমা হয়ে যায় না।


যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শন ও নজরদারি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে দেশটির বর্তমান পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।


খামেনির পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী ফতোয়া পুনর্বিবেচনার দাবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিতর্কও জোরালো হচ্ছে। দেশটির কট্টরপন্থি আইনপ্রণেতা হাসান নাতাজ ও আহমদ নাদেরিসহ কয়েকজন প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জারি করা পারমাণবিক অস্ত্রবিরোধী ধর্মীয় ফতোয়া পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন।


তাঁদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হুমকি মোকাবিলায় ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্রকে প্রতিরোধের উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত কি না, তা নিয়ে তেহরানের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মহলে আলোচনা চলছে।


ইরানের পারমাণবিক নীতি নিয়ে আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে উল্লেখ করা হয়, খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি, মজুত ও ব্যবহারকে ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেই অবস্থান পুনর্বিবেচনার দাবি দেশটির পারমাণবিক নীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।


তবে কয়েকজন আইনপ্রণেতার এই দাবি ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। দেশটির নেতৃত্ব ফতোয়া পরিবর্তন বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।