জ্বালানি ও খুচরা যন্ত্রাংশের তীব্র সংকটে আগে থেকেই টালমাটাল ছিল কিউবার বিদ্যুৎ খাত। সেই নাজুক অবস্থার মধ্যেই জাতীয় গ্রিডে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসায় মুহূর্তেই পুরো দেশ অন্ধকারে ডুবে যায়।


রবিবার (২ আগস্ট) গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ঘোষণার মাধ্যমে এ তথ্য জানায় কিউবার রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ কোম্পানি ‘ইউনিয়ন ইলেকট্রিকা’ (ইউএনই)। তবে বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারণ, এর বিস্তৃতি কিংবা কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে—এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।


এর আগেই রাজধানী হাভানায় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ছিল অস্থির। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, সার্কিট বিকল হওয়া এবং উৎপাদন ঘাটতির কারণে পরিকল্পিত লোডশেডিং চালু রাখতে হচ্ছে।


বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রোববার ভোর থেকেই গুয়ানাবাকোয়া, হাবানা দেল এস্তে, লা লিসা ও মারিয়ানাওসহ বিভিন্ন পৌরসভা থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে অসংখ্য অভিযোগ জমা পড়ে।


সাধারণত এমন দেশব্যাপী ব্ল্যাকআউটের ক্ষেত্রে প্রথমেই হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও খাদ্য সংরক্ষণাগারের মতো জরুরি খাতে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিচ্ছিন্ন ছোট পাওয়ার নেটওয়ার্ক চালু করা হয়। এরপর ধাপে ধাপে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে পুনঃসংযুক্ত করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।


দেশব্যাপী ঘন ঘন ব্ল্যাকআউট:


রোববারের এই ঘটনাটি চলতি বছর দেশজুড়ে চলা ধারাবাহিক ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের সর্বশেষ উদাহরণ। এর আগে গত জুলাই মাসে মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে তিনবার জাতীয় গ্রিডে বিপর্যয় ঘটেছিল, যার মধ্যে একই সপ্তাহে দুবার পুরো দেশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে একটি বিপর্যয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ অন্ধকারে তলিয়ে যায়। সেবার নেটওয়ার্ক পুনরায় চালু করার পরও চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে না পারায় সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কর্তৃপক্ষকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছিল।


জ্বালানি ও যন্ত্রাংশের অভাব এবং পুরোনো থার্মোইলেকট্রিক বা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বারবার ত্রুটির কারণে কিউবার বিদ্যুৎ ব্যবস্থা চরম আকার ধারণ করেছে। দেশটির কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়স ৩০ বছরেরও বেশি এবং এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণও হয়েছে সামান্যই।


যুক্তরাষ্ট্রকে দুষছে কিউবা সরকার:


কিউবা সরকারের অভিযোগ, এই সংকটের পেছনে ওয়াশিংটন দায়ী। যুক্তরাষ্ট্র কিউবায় তেল সরবরাহের পাশাপাশি অর্থায়ন ও সরঞ্জাম পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। গত ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো অপহৃত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কিউবার ওপর তেল অবরোধ আরোপ করেন, যার ফলে কিউবা তাদের জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস হারায়।


দীর্ঘদিন ধরেই কিউবার প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ ছিল ভেনেজুয়েলা। কিন্তু ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে মেক্সিকো থেকেও তেল আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দশকের পর দশক ধরে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগের অভাব এবং অব্যবস্থাপনাই মূলত এই তীব্র সংকটের জন্য দায়ী।


দীর্ঘস্থায়ী এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে দেশটির পরিবহন ব্যবস্থা, পানি সরবরাহ, টেলিযোগাযোগ এবং চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্রীষ্মের এই প্রচণ্ড গরমে খাবার সংরক্ষণ, রান্না করা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে পর্যন্ত চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।