মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে আবারও যুদ্ধের ঘনঘটা দেখা দিচ্ছে। ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরিতা এখন চূড়ান্ত সংঘাতের রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু হুঁশিয়ারি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক গতিবিধি এই আশঙ্কাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংস দমন-পীড়ন চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারে, এমন প্রচ্ছন্ন হুমকি ট্রাম্প বারবার দিয়ে আসছেন। 


গত মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে দেওয়া তাঁর ‘সাহায্য আসছে’ বার্তাটি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জল্পনার জন্ম দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে, যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালায়, তবে সেই হামলার ধরন কেমন হতে পারে এবং তেহরানই বা এর জবাবে কী পদক্ষেপ নেবে।


বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত রয়েছে। বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আটটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এর মধ্যে কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে প্রায় ১০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই ঘাঁটির কিছু কর্মীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যদিও এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবে সামরিক বিশ্লেষকরা একে সম্ভাব্য যুদ্ধের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবেই দেখছেন। অতীতেও ইরানের সাথে উত্তেজনার সময় এই ঘাঁটিটি তেহরানের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।


ইরানে সামরিক হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হাতে বেশ কিছু বিকল্প রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত আফগানিস্তান বা ইরাকের মতো দীর্ঘমেয়াদি স্থল যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগের মেয়াদের নীতিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি বড় ধরনের সেনা মোতায়েনের চেয়ে সংক্ষিপ্ত ও লক্ষ্যভেদী অভিযান বেশি পছন্দ করেন। অস্ট্রেলিয়ার ডেকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহরাম আকবরজাদেহের মতে, ট্রাম্প এমন অভিযান চান যেখানে মার্কিন সেনাদের জীবনের ঝুঁকি ন্যূনতম থাকে কিন্তু লক্ষ্য অর্জন হয় শতভাগ। সে ক্ষেত্রে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ড্রোন হামলা কিংবা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে বিমান হামলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।


ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানিকে যেভাবে ২০২০ সালে বাগদাদে হত্যা করা হয়েছিল, ইরানের বর্তমান শীর্ষ নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তেমন কোনো ছক ওয়াশিংটন আঁকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খোদ ট্রাম্প নিজেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান সম্পর্কে অবগত আছেন বলে দাবি করেছেন। অধ্যাপক ভালি নাসরের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হয়তো শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি উপড়ে ফেলা নয়, বরং শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দিয়ে বর্তমান কাঠামোকে এমনভাবে দুর্বল করে দেওয়া, যাতে তারা পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের শর্ত মানতে বাধ্য হয়। এটি হবে এক ধরনের ‘গেম চেঞ্জিং’ অপারেশন, যা দেশটিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।


তবে ইরানে এ ধরনের অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য মোটেও সহজ হবে না। ভেনেজুয়েলায় নিকোলা মাদুরোর বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের উদাহরণ টানা হলেও ইরানের ভৌগোলিক ও সামরিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইরানের শক্তিশালী বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা মার্কিন পরিকল্পনার জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া, কোনো ধরনের বিমান হামলা বা ড্রোন হামলার জবাবে ইরান যদি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা আঘাত হানে, তবে তা একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে ইরানের বাঙ্কার বাস্টার বোমা প্রতিরোধী ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলো ধ্বংস করা সাধারণ আকাশ হামলার মাধ্যমে প্রায় অসম্ভব।


অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। তিনি ঐতিহাসিকভাবেই বিদেশের মাটিতে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা ‘নেশন বিল্ডিং’ প্রক্রিয়ার বিরোধী। আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের যে প্রক্রিয়া তিনি শুরু করেছিলেন, তা থেকে স্পষ্ট যে তিনি মার্কিন কোষাগারের অর্থ ভিনদেশের যুদ্ধে ব্যয় করতে আগ্রহী নন। তাই ইরানে স্থল সেনা পাঠিয়ে দখলদারিত্ব কায়েম করার কোনো পরিকল্পনা ওয়াশিংটনের নেই বললেই চলে। পরিবর্তে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সুনির্দিষ্ট সামরিক আঘাতের মাধ্যমে ইরানকে ভেতর থেকে অস্থিতিশীল করে তোলাই হতে পারে মার্কিন কৌশল।


সব মিলিয়ে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ এখন বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক জটিল দাবার চালে পরিণত হয়েছে। ট্রাম্পের ‘সাহায্য’ পৌঁছানোর বার্তাটি কেবল কথার কথা নাকি কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক অভিযানের পূর্বাভাস, তা সময়ই বলে দেবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, যদি কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবে তার প্রভাব কেবল তেহরান বা ওয়াশিংটনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিতে পারে।